মক্কার ইতিহাস শুধু ধর্মীয় আচারে আবদ্ধ নয়, এর প্রতিটি কণা শতাব্দীর রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সাক্ষী। নির্বাসন, বিদ্রোহ, বাণিজ্য ও রূপান্তরের দীর্ঘ ইতিহাসবাহী এই নগরী সম্পর্কে অনেক তথ্য আমাদের অজানা। এখানে সেই কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো।

সাধারণ ধারণা, নবী ইসমাইল (আ.)-এর বংশধররা প্রাচীনকাল থেকে মহানবী (সা.)-এর সময় পর্যন্ত মক্কায় অবিচ্ছিন্নভাবে বাস করেছেন। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। ইসমাইল (আ.) ইয়েমেনের জুরহুম গোত্রে বিবাহ করেন এবং দীর্ঘদিন এই গোত্রই মক্কা শাসন করে।

কিন্তু জুরহুমরা একসময় হাজিদের প্রতি অনাচার ও কাবার অবমাননা শুরু করলে ইয়েমেনি গোত্র ‘খুজাআ’ তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তারা জুরহুমদের পরাজিত করে মক্কা থেকে বিতাড়িত করে এবং কাবার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/১৮৬, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)

পরবর্তীতে ৫ম শতকে কোরাইশরা মক্কার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে এবং ইসমাইল (আ.)-এর বংশধারীদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

মক্কা ত্যাগ করার সময় জুরহুমরা জমজম কূপে মূল্যবান সম্পদ পুঁতে রেখে যায়। তারা কূপটি ভরাট করে দেয় এবং এটি দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে।

নবীজি (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নের নির্দেশে এটি পুনরায় খনন করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৪৩, মুস্তাফা আল-বাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

আজও এই কূপের পানি কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করছে।

ইসলামের আগমনের অনেক আগে থেকেই মক্কা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত কাফেলার জন্য এটি নিরাপদ বিশ্রামস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।

পবিত্র কোরআনে এই বাণিজ্য সফরের উল্লেখ আছে। (সুরা কোরাইশ, আয়াত: ১-২)

মক্কার বাণিজ্যিক সাফল্যের পেছনে এর পবিত্রতা ছিল অন্যতম কারণ। হারাম শরীফে যুদ্ধ নিষিদ্ধ থাকায় আরবের বিভিন্ন গোত্র এখানে নিরাপদে ব্যবসা ও মধ্যস্থতা করতে পারত।

বিদেশি ব্যবসায়ীদের উপর স্থানীয় প্রভাবশালীদের জুলুম বন্ধ করতে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে এক ঐতিহাসিক জোট গঠিত হয়। নবীজি (সা.) যুবক বয়সে এতে অংশ নিয়েছিলেন।

নবুয়ত লাভের পর তিনি এর প্রশংসা করে বলেন, “যদি ইসলাম আসার পরেও আমাকে এমন কোনো চুক্তিতে ডাকা হতো, তবে আমি তাতে সাড়া দিতাম।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৩৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৯)

কোরাইশরা বছরে দুবার বড় বাণিজ্য সফরে যেত। শীতকালে ইয়েমেন এবং গ্রীষ্মে সিরিয়ায়। এতে মক্কা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ রক্ষা করত।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “কোরাইশদের আসক্তির কারণে—শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের প্রতি তাদের আসক্তির কারণে।” (সুরা কোরাইশ, আয়াত: ১-২)

এই বাণিজ্যের ফলে আব্দুল্লাহ ইবনে জাদানের মতো ধনীরা সিরিয়ার দুর্ভিক্ষগ্রস্ত মানুষের জন্য হাজারো উটবোঝাই খাবার পাঠাতে পারতেন।

মক্কার চারপাশের নির্দিষ্ট এলাকা ‘হারাম’ ঘোষিত। এর মধ্যে যুদ্ধ, গাছ কাটা বা শিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

নবীজি (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন ঘোষণা করেন, “এই শহরকে আল্লাহ পবিত্র করেছেন... এর কোনো কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা যাবে না এবং এর শিকার তাড়িয়ে দেওয়া যাবে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৩৩)

হজের সাফা-মারওয়া সাইয়ের ঘটনা হাজরত হাজেরা (আ.)-এর শিশু ইসমাইলের জন্য পানি খোঁজার স্মৃতি। আল্লাহ এটিকে কেয়ামত পর্যন্ত ইবাদত হিসেবে কবুল করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৮)

মক্কা একসময় একত্ববাদের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ‘আমর ইবনে লুহাই’ সিরিয়া থেকে ‘হুবাল’ মূর্তি নিয়ে কাবার সামনে স্থাপন করে মূর্তিপূজা প্রচলন করেন।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী, সে-ই প্রথম আরবে মূর্তিপূজার প্রথা শুরু করেছিলেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৭৬, মুস্তাফা আল-বাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

নবীজি (সা.) মক্কা বিজয়ে কাবার চারপাশের ৩৬০ মূর্তি অপসারণ করেন।

আজকের মক্কা আধুনিক। আবরাজ আল-বাইত কমপ্লেক্স বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তবু আধ্যাত্মিক পরিবেশ রক্ষায় চেষ্টা চলছে। প্রতিদিন কয়েক লক্ষ হাজি আধুনিক সুবিধায় ইবাদত করছেন।

মক্কার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর নিরাপত্তা। দাজ্জালের ফিতনা থেকেও এটি নিরাপদ থাকবে। নবীজি (সা.) বলেছেন, “মক্কা ও মদিনা ছাড়া এমন কোনো শহর নেই যা দাজ্জাল পদদলিত করবে না...।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৮১)

এই নিরাপত্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত।