পবিত্র কোরআনে ঋণ দেওয়াকে ‘আল্লাহকে ঋণ দেওয়া’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, অভাবের কারণে ঋণগ্রহীতা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারেন না। এমন সময় পাওনাদার যদি পাওনা টাকা মকুফ করে দেন, তাহলে তা নফল সদকা হিসেবে গণ্য হয়।

কিন্তু এই বকেয়া পাওনাকে সরাসরি জাকাত হিসেবে ধরলে কি জাকাত আদায় হবে?

ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদদের মধ্যে এই বিষয়ে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতামত হলো—পাওনা টাকা মকুফ করে জাকাত হিসেবে গণ্য করা সরাসরি জায়েজ নয়। তবে কিছু বিশেষ অবস্থায় বিকল্প পথ রয়েছে।

যারা অভাবীকে উত্তম ঋণ দেয়, আল্লাহ তাদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং আমলনামায় বহুগুণ সওয়াব বৃদ্ধি করেন।

অভাবী ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়া বা পুরো ঋণ মাফ করা মহানুভবতার পরিচয়। আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “যদি ঋণগ্রহীতা অভাবী হয়, তবে তাকে স্বচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত। আর যদি তোমরা তা সদকা (মাফ) করে দাও, তবে সেটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮০)

কোরআনে বলা হয়েছে, “যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে তিনি তা তোমাদের জন্য দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন।” (সুরা তাগাবুন, আয়াত: ১৭)

পাওনাদার যদি ঋণগ্রহীতাকে বলেন, “তোমার কাছে আমার যে পাওনা ছিল, সেটি আমি জাকাত হিসেবে কেটে নিলাম এবং তোমাকে মাফ করে দিলাম”—এতে জাকাত আদায় হবে কি না, তা নিয়ে দুটি প্রধান মত রয়েছে।

১. অধিকাংশ আলেমের মত: ইমাম আবু হানিফা, আহমদ ও ইমাম নববির মতে, এভাবে সরাসরি ঋণ মকুফ করলে জাকাত আদায় হয় না। কারণ জাকাত আদায়ের জন্য ‘তামলিক’ বা মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া শর্ত। অর্থাৎ জাকাতের টাকা দাতার হাত থেকে গ্রহীতার হাতে পৌঁছাতে হবে। ঋণ মকুফ করা একটি দায়মুক্তি, যা সম্পদ হস্তান্তরের সমতুল্য নয়।

জাকাত দাতার জিম্মায় একটি দায়, যা কেবল গ্রহীতাকে অর্থ প্রদানের মাধ্যমেই পূরণ হতে পারে।
ইমাম নববি (রহ.), আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব

ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, জাকাত দাতার জিম্মায় একটি দায়, যা কেবল গ্রহীতাকে অর্থ প্রদানের মাধ্যমেই পূরণ হতে পারে। (আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ৬/২১০, দারুল ফিকর, বৈরুত)

২. কিছুসংখ্যক আলেমের মত: হাসান বসরি ও আতা (রহ.)-এর মতো কেউ কেউ মনে করেন এটি জায়েজ। তাঁদের যুক্তি—জাকাতের টাকা গ্রহীতাকে দিয়ে সে আবার পাওনা শোধ করলে যদি জায়েজ হয়, তবে সরাসরি মাফ করাতেও বাধা নেই। এটি সহজতর পথ।

অধিকাংশ আলেম যে পদ্ধতিকে নিরাপদ মনে করেন, তা হলো—জাকাত দাতা প্রথমে জাকাতের টাকা সরাসরি ঋণগ্রহীতাকে নগদ দিবেন। তারপর গ্রহীতা স্বেচ্ছায় ঋণ শোধ করলে জাকাত আদায় হয়।

তবে শর্ত, জাকাত দেওয়ার সময় গ্রহীতাকে বাধ্য করা যাবে না যে “এই টাকা দিয়ে আমার ঋণ শোধ করতে হবে।” গ্রহীতা চাইলে অন্য কাজে খরচ করতে পারেন।

যদি পাওনাদার অত্যন্ত স্বচ্ছল হন এবং নফল সদকা করার সামর্থ্য থাকে, তবে পাওনা জাকাত হিসেবে না ধরে সরাসরি মাফ করাই উত্তম। কিন্তু নিজে টানাটানিতে থাকলে জাকাতের খাত থেকে সাহায্য করতে পারেন। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/৭১০, দারু তৈয়্যিবাহ, ১৯৯৯)

ব্যবসার বকেয়া পাওনা বা অনাদায়ী পণ্যমূল্যকে জাকাত হিসেবে মকুফ করা বৈধ নয়। কেবল ব্যক্তিগত বা করজে হাসানার ক্ষেত্রেই এই আলোচনা কার্যকর।

ঋণ মকুফ করে জাকাত গণ্য করতে দুটি শর্ত মেনে চলতে হবে:

প্রকৃত অভাবী: ঋণগ্রহীতা জাকাতপাওয়ার যোগ্য অভাবী হতে হবে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও না দেওয়া হলে (টালবাহানা) জাকাত হিসেবে গণ্য যাবে না।

ব্যবসায়িক দেনা নয়: ব্যবসার বকেয়া পাওনা বা অনাদায়ী পণ্যমূল্যকে জাকাত হিসেবে মকুফ করা বৈধ নয়। কেবল ব্যক্তিগত বা করজে হাসানার ক্ষেত্রেই এই আলোচনা কার্যকর।

পাওনা মকুফ করে মুসলিম ভাইয়ের লজ্জা দূর করা মর্যাদাপূর্ণ। তবে ফরজ জাকাত আদায়ে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। সরাসরি মকুফ না করে নিয়ম মেনে জাকাত প্রদানই নিরাপদ পথ।