‘মানে?’ শব্দটি বিকেলের নিস্তব্ধতাকে যেন চূর্ণ করে দিল। সনাতন তৎক্ষণাত্ কোনো উত্তর দিল না। সে গভীর এক শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল, তারপর খুব নিচু ও ভিজে গলায় বলল—

‘শামীম, এই ছোট জীবনে আমরা কত রকম মুখোশই তো পরি! কিন্তু জানিস, আমি এমন কিছু মানুষ দেখেছি যারা সত্যিকারের নিঃস্বার্থ। তারা কোনো প্রতিদান বা হাততালি চায় না; শুধু চায় তৃণমূলের অবহেলিত মানুষেরা একদিন সমাজের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারে। এই মানুষকে বুক দিয়ে আগলে তোলার জেদটি ঈশ্বরপ্রদত্ত পবিত্র ভালোবাসা। কিন্তু এর উল্টোদিকে রয়েছে ভয়ংকর হাহাকার।’

শামীম পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল। সনাতন তার চোখের গভীরে তাকিয়ে বলতে থাকল, ‘কিছু মানুষ ভালোবাসার অভিনয় করে শুধু নিজের লাভের জন্য। তারা মানুষের উপকার করে ঠিকই, কিন্তু আড়ালে প্রতিটি পদক্ষেপ নিজের স্বার্থের পাল্লায় মেপে নেয়। এই ভালোবাসা হৃদয় থেকে আসে না রে শামীম; এটা নিজেকে বড় করার স্বার্থপর সিঁড়ি। এরা বাইরে দেবতুল্য সাজলেও ভিতরে প্রচণ্ড হিংসায় থাকে। তারা চায় না কেউ তাদের চেয়ে বড় হয়। তাই কথার ধারালো আঘাতে অন্যকে ক্ষতবিক্ষত করে, ভয় দেখিয়ে দাবিয়ে রাখে যাতে তাদের মেকি রাজত্ব টিকে থাকে।’

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

সনাতন তখন শামীমের কাঁধে হাত রাখল। সেই স্পর্শে মায়া ও শাসনের অদ্ভুত মিশ্রণ। কাঁপা গলায় সে বলল, ‘কিন্তু জানিস শামীম? ধর্ম আমাদের শেখায়—স্রষ্টা কারো জন্য ক্ষমার পথ বন্ধ করেননি। মানুষ হিসেবে ভুল করা স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু সেই ভুলকে পুঁজি করে অহংকারে মত্ত হওয়া সবচেয়ে বড় পাপ। নিজের সামান্য লাভের জন্য কারো মনে চাবুকের মতো আঘাত দেওয়া কি আমাদের নৈতিকতা? শামীম, অনুশোচনার এক ফোঁটা জল চোখের কোণে গড়িয়ে পড়লে দীর্ঘদিনের কালিমা ধুয়ে যায়। স্রষ্টা বারবার ফিরে আসার সুযোগ দেন।’

শামীমের চোখের মণি তখন স্থির। কপালের রগগুলো কাঁপছে, যেন ভেতরের যুদ্ধ বাইরে বেরোতে চায়। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে আবার ফিসফিস করে বলল, ‘মানে?’

বিকেলের শেষ রক্তিম আলো তখন মিলিয়ে গেছে। অন্ধকারের বুকে সনাতনের শেষ কথা শামীমের কানে মন্ত্রের মতো বাজল— ‘মানেটা হলো শামীম, সময় ফুরানোর আগে আয়নার সামনে দাঁড়ানো জরুরি। মুখোশ লোকচক্ষুর সামনে ছিঁড়ে পড়ার চেয়ে নিজের হাতে খুলে ভালো পথে ফিরে আসা কি বেশি সম্মানের নয়? যারা ভুল করেছে, তারা কি এখনো তওবা করে আলোর পথে ফিরতে পারে না?’ চলবে...