১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। সেই বছরের ২৯ এপ্রিল সাংগঠনিক কাজে কক্সবাজারে যাই। দিনের শুরু হয় সাধারণ দিনের মতোই। তবে আকাশের দিকে চেয়ে একটা গুমোট ভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল। আগে থেকে ১০ নম্বর মহা বিপৎসংকেত দেওয়ায় লোকজনের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। কিন্তু আমরা তখনো পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারিনি।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে আবহাওয়ার পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়। আকাশ ক্রমশ কালো হয়ে যায়। বাতাসে চাপা গর্জন শোনা যায়। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মনে হয় যেন অজানা শক্তি সমুদ্রের বুকে উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি করছে।

সন্ধ্যার পর আমরা কক্সবাজারের পাহাড়চূড়ায় হিলটপ সার্কিট হাউসে অবস্থান নিই। স্থানটি তুলনামূলক নিরাপদ। রাত নামতেই বাতাসের গতি হঠাৎ বেড়ে যায়। প্রথমে মনে হয় সাধারণ ঝড়, কিন্তু কিছুক্ষণ পর তা প্রলয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেয়। ২৫০ কিলোমিটার গতির বাতাস যেন হাজারো বন্য জন্তুর গর্জন। জানালার কাচগুলো প্রচণ্ড শব্দে কাঁপে। মনে হয় সেগুলো ভেঙে উড়ে যাবে। দরজাগুলো শক্ত করে বন্ধ থাকলেও বাতাসের বেগে ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। চারপাশে গভীর অন্ধকার নেমে আসে। মাঝেমধ্যে বিজলির ঝলকানিতে আকাশ ছিন্নভিন্ন হয়। সেই আলোয় দূরের গাছপালা ভেঙে পড়তে দেখা যায়। মনে হয় পুরো পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে। বাতাস যেন কক্সবাজার শহর উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ঝড়ের শব্দের মধ্যেও মানুষের আর্তনাদ, চিৎকার আর কান্না কানে ভেসে আসে।

আমরা সার্কিট হাউসের ভেতরে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করি। রাতের এক পর্যায়ে মনে হয় এই ভবনও টিকবে না। হয়তো এই রাতই আমাদের শেষ রাত।

দীর্ঘ ভীতিকর রাত কেটে ভোর হয়। বাইরে বেরিয়ে দেখি চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। গাছপালা উপড়ে পড়ে আছে, ঘরবাড়ি নেই, রাস্তা ভেঙে গেছে। সমুদ্রসৈকত এলাকায় অসংখ্য মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ছোট শিশুদের প্রাণহীন দেহ দেখে বুক মোচড় খায়। পাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, ‘এইটা আমার নাতি…।’ আর কোনো শব্দ বের হয় না তাঁর মুখ থেকে। আমরা কেউ কথা বলতে পারি না।

সাংগঠনিক কাজ শেষ করে ৩০ এপ্রিল সকালে চট্টগ্রামে ফিরার কথা ছিল। কিন্তু চারদিকের অবস্থা দেখে ফিরতে পারি না। সঙ্গীদের নিয়ে সন্দ্বীপে যাই।

সেখানে পৌঁছে মনে হয় পুরো দ্বীপ হারিয়ে গেছে। ঘরবাড়ি নেই, মানুষ নেই; শুধু ধ্বংসস্তূপ আর শূন্যতা। এক ব্যক্তি বললেন, ‘আমার পরিবারে আটজন ছিল। কেউ বেঁচে নেই...এখন আমি একা।’ তাঁর চোখে পানি নেই, শুধু গভীর শূন্য দৃষ্টি।

পরে জানা যায়, এটি শুধু ঝড় ছিল না; এক মহাবিপর্যয়। ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়। লাখ লাখ মানুষ আহত এবং প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সে সময় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অভাব ক্ষয়ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতিগুলোর একটি। আজও চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে সেই রাতের দৃশ্য, ঝড়ের গর্জন, মানুষের চিৎকার আর মৃত্যুভীতির কাঁপুনি।

  • দিলশাদ আহমেদ, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, চট্টগ্রাম