২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তিন মাসের শেনজেন ভিসা নিয়ে সহধর্মিণীসহ এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট যাত্রা শুরু করি। যাত্রার মূল লক্ষ্য ছিল স্টুটগার্টে বসবাসকারী ছোট মেয়ে আনিকা ও তাঁর সদ্যোজাত কন্যা রূপকথাকে প্রথম দেখা—এক আবেগময় পুনর্মিলনের স্পর্শ। দুবাইয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা যাত্রাবিরতির পর ফ্রাঙ্কফুর্টের পথে আবার রওনা দিই। স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫ মিনিটে বিমান ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে অবতরণের ঠিক আগে মনে ভেসে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলপ হিটলারের দাপট ও দোর্দণ্ড প্রতাপের মর্মান্তিক ইতিহাস। আজকের প্রজন্মের কাছে জার্মানি বলতে একদিকে আধুনিকতা, শৃঙ্খলা ও প্রযুক্তির শিখর; অন্যদিকে নাৎসিদের নির্মমতা, গণহত্যা ও মানবতার চরম অপমান।
বিমানবন্দরের ভিড় পেরিয়ে বেরিয়ে অপেক্ষায় থাকা অনিত গেটে আমাদের স্বাগত জানায়। চার স্যুটকেস ও দুটি ছোট ট্রলি নিয়ে নিচতলার রেলস্টেশনে ছুটি। ডিসপ্লে বোর্ডে দেখা যায়, ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে স্টুটগার্ট ট্রেন ছাড়তে মাত্র ৫ মিনিট বাকি। হালকা বৃষ্টি-ঠান্ডায় লাগেজসহ রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াই, কারণ পরের ট্রেন রাত ১টা ৩০ মিনিটে।
বিরতিহীন ট্রেনে চড়ে বসি। রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ট্রেন প্রস্থান করে। আসনের সামনে এক জার্মান নারীর পোষা নাদুসনুদুস জার্মান শেফার্ড কুকুর দেখে ভয়ে কেঁপে উঠি। ছোটবেলায় কুকুরের কামড়ে নাভির পাশে ১৪টি ইনজেকশন নেওয়ার স্মৃতি এখনো তাজা। শান্ত কুকুরের চোখে চোখ পড়লেই চোখ বন্ধ হয়ে যায়। ট্রেনের জানালা দিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্টের আলোকিত শহর উপভোগ করি এবং নতুন অতিথির জন্য সময় গুনি। দেড় ঘণ্টায় ৯২ কিলোমিটার পথ কাটিয়ে স্টুটগার্ট পৌঁছাই। অনিতের গাড়ি নিয়ে হেলেনবাডের আবাসে যাই, যেখানে শুরু হয় নতুন অনুভূতির অধ্যায়।
জার্মানিতে এখন হিটলারের নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করতে চায় কেউ নয়। যুদ্ধের পর বিভক্ত জার্মানির প্রাচীর ভেঙেছে, অতীতের ক্ষত মুছে উন্নয়নের শিখরে দাঁড়িয়েছে দেশটি। তবে যুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলেনি; সতর্কতার জন্য কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে নাৎসি বর্বরতার নিদর্শন সংরক্ষণ করেছে। এগুলো এখন মেমোরিয়াল বা জাদুঘর হিসেবে বার্লিন, মিউনিখসহ স্থানে খোলা।
স্টুটগার্টে এসে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প দেখার ইচ্ছা জানাতে আনিকা-অনিত প্রথমে আগ্রহী হয়নি। আনিকা ২০২৪ সালে মিউনিখে চাকরির কারণে এক বছর কাটিয়েছে। তাঁরা বলেছিলেন, ‘বাবা, ওখানে গেলে মনটা খুব ভারী হয়ে যাবে।’ কথাগুলো সত্যি ছিল, তবু আমার আবদারে রাজি হন।
ইতিহাস বইয়ে পড়া যায়, কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করা ভিন্ন। সেই অভিজ্ঞতার সন্ধানে ৮ নভেম্বর ২০২৫-এ মিউনিখের কাছে ডাকাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। যুদ্ধের ইতিহাস পড়ে প্রায়ই ভাবি—মানুষ কি এত নিষ্ঠুর হতে পারে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ডাকাউ যাই।
স্টুটগার্ট থেকে ডাকাউ ২০৩ কিলোমিটার দূরে। অনিতের দক্ষ ড্রাইভিংয়ে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিটে দুপুর ১২টায় পৌঁছাই। প্রশস্ত হাইওয়েতে সবাই সুশৃঙ্খল, সংযমী—চার লেনে সারিবদ্ধ গাড়ি, গতি নিয়ন্ত্রিত, দু'ধারে সবুজ-হলুদ গাছ, সমতল ও পাহাড়। মাঝপথে রিসোর্টে চা খেয়ে গন্তব্যে পৌঁছাই।
প্রবেশমুহূর্ত—
ক্যাম্পের প্রবেশপথে পৌঁছতেই এক বিদেশি দর্শনার্থী হঠাৎ পড়ে যান, মাথা ফেটে রক্ত ঝরে। আতঙ্ক ছড়ায়, সবাই নির্বাক। আনিকা কাঁপা হাতে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স-পুলিশ ডাকে। অল্পক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স এসে আহতকে নিয়ে যায়। এই রক্তাক্ত দৃশ্য যেন ডাকাউর অতীতের সঙ্গে মিশে যায়।
প্রতারণার দরজা—
ক্যাম্পে টিকিট ছাড়াই প্রবেশ। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে লোহার গেট দিয়ে ঢুকলে দেখি ‘ARBEIT MACHT FREI’—‘কাজ মানুষকে মুক্ত করে’। এ নিষ্ঠুর প্রতারণা। অন্য ক্যাম্পেও এই স্লোগান, কিন্তু কাজ দিল না মুক্তি, দিল শ্রম, যন্ত্রণা, মৃত্যু। এই গেট দিয়ে হাজারো মানুষ প্রবেশ করেছিল মৃত্যুর দিকে।
মিউজিয়ামের ভেতরে: দলিলের নীরব ভাষা—
আনিকা-অনিত রূপকথাকে নিয়ে জাদুঘর এড়িয়ে বাইরে সময় কাটায়। আমি সহধর্মিণীসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখার সিদ্ধান্ত নিই।
জাদুঘরে দেয়ালে সাদা-কালো ছবির সারি—কঙ্কালসার বন্দী, ভীত দৃষ্টি। প্রতিটির নিচে তারিখ, দেশ, অভিযোগ, বন্দিত্বকাল। এক মানচিত্রে ইউরোপ থেকে বন্দী আনার রুট চিহ্নিত। রেললাইন মিলেছে গেটে—জীবন থেকে মৃত্যুর পথ।
কাচের কেসে বন্দীদের জুতো, ছেঁড়া পোশাক, নম্বর ট্যাগ, চিঠি। এক ছোট চশমা দেখে মনে হয় কোনো সাধারণ মানুষের। ‘মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট’—চিকিৎসার নামে অমানবিকতা।
ব্যারাক, রোল-কল স্কয়ার, নীরবতা—সব ভয়াবহ সত্য বলে। প্রাঙ্গণে ঘণ্টার পর দাঁড় করানো হতো বন্দীদের। প্রক্ষালন, গোসলের ঘর, নির্যাতিতদের সামগ্রী দেখে শরীর হিম হয়।
এক ছবিতে শীর্ণ বন্দী, নিচে ‘Nothing but Skin and Bone’—হিটলারের দোসরদের নিষ্ঠুরতার প্রমাণ। জাদুঘর দেখে অনুভূতি ভারী হয়।
১৯৩৩ সালের ২০ মার্চ অ্যাডলফ হিটলার ডাকাউ উদ্বোধন করেন হাইনরিখ হিমলার ও নাৎসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তিনি সাধারণত ক্যাম্প দেখতেন না, নির্দেশ দিতেন এসএস-কে।
২১ হেক্টর এলাকায় নির্মিত ক্যাম্প থেকে দক্ষিণ জার্মানি-অস্ট্রিয়ায় ১৪০টির বেশি উপশিবির। পরাজয়ের পর অধিকাংশ ধ্বংস, তবে ২০-২৫টি স্থানে স্মৃতিফলক রয়েছে।
ব্যারাকে কাঠের বহুতল খাট—দুজনের জন্য পাঁচ-ছয়জন গাদাগাদি। শীত-অনাহারে রোগ ছড়াত। ভোরে রোলকল, অন্ধকার বাংকারে নির্যাতন। নাম, মর্যাদা, জীবন কেড়ে নেওয়া হতো। আগামী পর্বে শেষ...
বি.দ্র.— ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর আমার ভ্রমণোত্তর ইতিহাস, সংগৃহীত তথ্য ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাভিত্তিক লেখা।






