১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, পরিবারের চার সদস্য নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে রওনা দিয়েছি। টয়োটা অ্যাক্সিও গাড়ি ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বসুন্ধরা থেকে ঢাকা ৮ ও ৯ আসনের দিকে ছুটছে। কুড়িল বিশ্বরোড, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা এমনকি রামপুরাতেও গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটারের ওপরে। এমন নির্বিঘ্ন চলাচল কীভাবে সম্ভব? কোনো ব্রেক লাগছে না। পথে শুধু বাংলার বাহন ‘টেসলা’র উৎপাত, তেলাপোকা সিএনজির ঘূর্ণিপাক আর দু-একটা প্রাইভেট কারের রাস্তা দখলের চেষ্টা ছাড়া অন্য কোনো যানবাহনের কোলাহল নেই। ফলে গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছানোর কোনো বাধা নেই। এই অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতায় বিস্মিত হয়ে আমরা সামনে এগোয়ারি চালিয়ে যাই।

মালিবাগের ডিআইটি রোড হয়ে আবুল হোটেলকে ডানে ফেলে শহীদ বাকি সড়ক ধরি। পুরোনো স্মৃতি যেন মস্তিষ্কের বাইরের স্তরে জেগে ওঠে। যত এগোয়া হয়, সেই স্তর আরও সজাগ হয়। অপরূপ আনন্দে রোদ ঝলমল করে। পল্লিমা সংসদকে ডানে রেখে ভূতের আড্ডা, আপন কফি হাউস পার হয়ে তালতলা মার্কেটের কাছে পৌঁছাই। দীর্ঘ ছয়-সাত বছর পর এখানে আসা। মার্কেটকে বাঁয়ে ফেলে ডানে মোড় নিয়ে খিলগাঁও উচ্চবিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাই, যা ঢাকা ৮ আসনের একটি কেন্দ্র। এখানে সহধর্মিণী ও শ্যালিকাকে নামিয়ে আমি ছুটি আমার ভোটকেন্দ্র ঢাকা ৯–এর ৮৩ নম্বর কেন্দ্রের দিকে।

শহীদ বাকি সড়ক শেষ হতেই শুরু হয় নতুন সড়ক অতিশ দীপংকর। খিলগাঁও রেলগেটে পৌঁছে পড়ি বিশাল যানবাহনের ঘূর্ণিপাকে। মৌমাছির মতো অটোরিকশাগুলো ক্রমাগত ঘুরছে, বিকট হর্ন বাজাচ্ছে। রেলগেট দখলের আনন্দে তারা অনবরত হর্ন দিচ্ছে। ঝোড়ো হাওয়ায় পথ হারানোর মতো আমরাও অটোরিকশার ঝড়ে নাস্তানাবুদ হই।

অটোরিকশাগুলোকে জায়গা দিয়ে কোনোমতে ঝড় থেকে বের হই। অতীশ দীপংকর রোডের চায়না পার্ক রেস্তোরাঁ, বিলাস টেইলার্স পার হয়ে বাসাবো–মাদারটেক রোডে এসে মাথায় হাত। ৮ থেকে ১০ বছর পর এই সড়ক, একই ভাঙাচোরা অবস্থা—বেহাল ফুটপাত, নর্দমার পানি, ভাঙা ইট, ছোট-বড় গর্ত। এসব যানবাহনের সহনশীলতা পরীক্ষা করছে। আমরা উত্তীর্ণ হয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাই।

ভোটকেন্দ্রে ভলান্টিয়ারের নির্দেশে নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়াই। পেছন থেকে ডাক পড়ে—

— ভাইয়া, কেমন আছেন?

পেছনে তাকাতে দেখি, বন্ধুর ছোট ভাই।

— আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছ? এখন কোথায় জব করছ?

— আমি একটি ব্যাংকের ম্যানেজার…

কথার ফাঁদে পড়ে পুরোনো দিনের কথা শুরু হয়। লাইন ধীরে ধীরে এগোয়। ভোটকেন্দ্রের ভেতর চেনা মানুষের পরিবর্তিত চেহারা, ব্যস্ততা, কোলাহল, নতুন সাজসজ্জা—সব নতুন পরিবেশ তৈরি করে। এখানে এসে যুক্তিবোধ যেন চলে যায়, রোবটের মতো এগোয়া। সুশৃঙ্খলভাবে ভোটকক্ষের দিকে যাই।

ভোটকক্ষের সামনে ছোট লাইন। সামনের লোকটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করি—

• কেমন আছেন আপনি? আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?

লোকটি পেছন ফিরে তাকায়। যুবক বয়স থেকে তাঁকে দেখছি, দারিদ্র্যের সঙ্গী। এখনও তাই।

• চিনুম না মানে, কী কও তুমি! এখন কই থাকো?

আবার কথা শুরু। ওনার মায়ের খবর জানতে ইচ্ছে করে, উনি কি বেঁচে আছেন? ছোটবেলায় তাঁকে জ্বালিয়েছি। লাইন ভেতরে ঢোকে। ভোট দিয়ে বের হই।

বাইরে এসে বন্ধুর হাত ছাড়িয়ে এলাকার বড় ভাইদের ‘আরও কিছুক্ষণ থেকে যাও’ অনুরোধ উপেক্ষা করে সামনে এগোয়া। ভালোবাসার পরশ হৃদয়ে মেখে হাঁটি।

মানুষদের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ টিকে থাকুক আজীবন।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]