বছর দুয়েক আগে ঈদের ছুটি শেষে ট্রেনে বাসায় ফিরছিলাম। ট্রেনে উঠতেই যাত্রীদের ভিড়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হলাম। টিকিটে নির্দিষ্ট আসন থাকলেও ভিড়ের চাপে ভেতরে যাওয়ার উপায় ছিল না। তাই দরজার কাছেই অনিশ্চিতভাবে দাঁড়িয়েছিলাম। ঠিক তখনই বয়স্ক এক নারী ও তাঁর ছেলে ভিড় ঠেলে উঠলেন। নারীটি ভেতরে প্রবেশ করতে পারলেও ছেলেটি দরজায় আটকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন চলতে শুরু করল। আমার নড়বড়ে অবস্থান সত্ত্বেও ছেলেটির হাত ধরে টেনে রেখেছিলাম যাতে সে ছিটকে না পড়ে। সেদিন মনে হয়েছিল, ট্রেনটি যদি স্টেশনে আরও কিছুক্ষণ থামত তাহলে ঝুঁকি অনেকটা কমত।
পবিত্র ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৯৪ জন। আহত ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে সড়কেই ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়, যা ঝুঁকির প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়ে তোলে। বাস বা ট্রেনে ওঠানামার সময় পা পিছলে পড়ে যাওয়া কেবল মুহূর্তের ভুল নয়। এর পেছনে রয়েছে বাসের ডিজাইন (উচ্চ সিঁড়ি, রেলিংয়ের অভাব), চালকের আচরণ (পুরোপুরি থামার আগেই যাত্রী তোলা), স্ট্যান্ড ব্যবস্থাপনা (নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের অভাব) এবং যাত্রীর তাড়াহুড়ো—এই চার স্তরের সম্মিলিত ব্যর্থতা। একইভাবে ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর ক্রম, দূরত্ব বজায় রাখার পরিকল্পনার অভাব ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে দুর্ঘটনার দিকে নিয়ে যায়।
সম্প্রতি ২৬ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাস পড়ে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক, যানগুলোর আগে ওঠার প্রতিযোগিতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই ঘাট মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া পবিত্র ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত ৩৯৪ জন। আহত ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে সড়কেই ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২২ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয় (মুক্তকণ্ঠ, ৩০/০৩/২০২৬)।
ঈদের সময় পরিবহন চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। বিদ্যমান অবকাঠামো এই চাপ সামলাতে পারে না, ফলে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে উৎসব-পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনার হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বাড়ে। কারণ যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সড়কের সক্ষমতা অপরিবর্তিত। বাংলাদেশে এটি আরও জটিল কারণ মিক্সড ট্রাফিক সিস্টেম রয়েছে—একই সড়কে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, রিকশা ও পথচারী একসঙ্গে চলে, যা সংঘর্ষের ঝুঁকি বহুগুণ করে। এছাড়া ঈদের সময় চালকরা দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিয়ে মনোযোগহীন ও সিদ্ধান্তগ্রহণে দুর্বল হয়ে পড়েন। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭ ঘণ্টা জেগে থাকলে প্রতিক্রিয়াক্ষমতা ০.০৫ শতাংশ রক্তে অ্যালকোহলের সমতুল্য হয়ে যায়। অর্থাৎ ক্লান্তি একটি অদৃশ্য নেশা হিসেবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে পুলিশের গবেষণায় বলা হয়েছে, বেপরোয়া গতিতে চালানোর কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, যা মোটের ৪২ শতাংশ। পুলিশ সদর দপ্তরের ‘রিসার্চ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ইনোভেশন’ বিভাগ ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ ও কৌশল নিয়ে গবেষণা করেছিল। এতে যুক্ত ছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদের সময় সড়কে গাড়ির বাড়তি চাপে দুর্ঘটনা ও হতাহত বাড়ে।
অনেক ফেরিঘাটে ডিজিটাল কিউ বা সময়ভিত্তিক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। ফলে চালকরা আগে ওঠার প্রতিযোগিতায় নামে এবং ‘গেম থিওরিটিক’ পরিস্থিতি তৈরি হয়। যেখানে সবাই নিয়ম না মেনে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু সামগ্রিক ক্ষতি হয়। রোড সেফটি অডিট এখানে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সড়কের প্রতিটি অংশ বিশ্লেষণ করে ঝুঁকি চিহ্নিত ও সংশোধন করা হয়।
ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ছোট-মাঝারি দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয় না। ফলে প্রকৃত ঝুঁকির চিত্র পাওয়া যায় না এবং নীতিনির্ধারণে ডেটা গ্যাপ তৈরি হয়। এর সমাধানে পুলিশ, হাসপাতাল ও বিমা সংস্থার তথ্য একত্রিত করে সমন্বিত সিস্টেম ব্যবহার করা যেতে পারে।
গাড়িতে ওঠার মুহূর্তের দুর্ঘটনাগুলোকে ‘এন্ট্রি-পয়েন্ট রিস্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। বাসস্টপে দরজা ও প্ল্যাটফর্ম একই উচ্চতায় রাখলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে। ‘ডোর কন্ট্রোল সিস্টেম’ বাধ্যতামূলক করলে বাস-ট্রেন সম্পূর্ণ না থামলে দরজা খুলবে না। ফেরিঘাটে ডিজিটাল কিউ, লোড ম্যানেজমেন্ট এবং ঈদকালীন বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা চালু করা যেতে পারে। ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ এতে কার্যকর, যাতে সেফ রোড, সেফ ভেহিকল, সেফ স্পিড ও সেফ ইউজার একত্রে বিবেচনা করা হয়।
‘ভিশন জিরো’ নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। সুইডেন ১৯৯৭ সালে এই নীতি নেওয়ার সময় বলা হয়েছে, মানুষ ভুল করবে কিন্তু সেই ভুলের জন্য মৃত্যু অনিবার্য হতে দেওয়া যাবে না। সড়ক-পরিবহন নকশা এমন হবে যাতে মানবিক ত্রুটি প্রাণঘাতী না হয়। এতে নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পায়।
মানুষ যেন বুঝতে পারে, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, নিরাপদে পৌঁছানোই প্রধান। আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করে বিশ্বাস তৈরি করতে হবে। কাঠামোগত পুনর্গঠনে নীতি, প্রযুক্তি, আচরণ ও নৈতিকতা একসঙ্গে কাজ করবে। অন্যথায় ঝুঁকির পুনরাবৃত্তি চলতে থাকবে এবং ঘটনা গণনাই পরবর্তী দুর্ঘটনার ভিত্তি হয়ে যাবে।
লেখক: অন্ জন কুমার রায়, ব্যাংকার
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]






