টরন্টোতে বিষাদের ছায়াটা নামতোই। প্রশ্ন ছিল, ছায়াটা কার মুখে রেখা টেনে মিলিয়ে যাবে দূরের দিগন্তে? বিষাদ–রেখাটা মাঝে রেখে দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই কিংবদন্তি— ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচ।

১০৯ মিনিটের ম্যাচে এই রেখা কখনো ভর করেছে মদরিচের মুখে, আবার কখনো রোনালদোর। শেষ পর্যন্ত অবশ্য রেখাটা থেকে গেল মদরিচের মুখে। আর এক চিলতে হাসি নিয়ে বিশ্বকাপে টিকে থাকলেন রোনালদো।

পর্তুগাল–ক্রোয়েশিয়ার দ্বিতীয়ার্ধের ৪৫ মিনিট (যোগ করা সময় যোগ করলে ৫৯) বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায়। এই অর্ধের পুরো চিত্রটা ফুটিয়ে তোলায় যায় ম্যাচের  বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রোনালদোর অভিব্যক্তি দিয়ে।

প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রোনালদোর চোখে–মুখে বইয়ে দিয়েছে আাবেগের ঝড়। শেষ পর্যন্ত রোনালদোর মুখে হাসি ফুটলেও, পথটা মোটেই সহজ ছিল না। কখনো কখনো এক চিলতে হাসি যে কতটা অমূল্য, সেটা এ ম্যাচে যারা রোনালদোকে দেখেছেন তাদের অজানা নয়।

.

শেষ ষোলোয় ওঠার এই ম্যাচে পর্তুগালের শুরুটা হয়েছিল আগ্রাসী ফুটবলে। যদিও প্রথমার্ধে দুই দলের কেউ গোল মুখ খোলার মতো দাপট দেখাতে পারেনি। আসল খেলাটা শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধে। ম্যাচের ৫৩ মিনিটে ইভান পেরিসিচের গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। পিছিয়ে পড়ার পর রোনালদোকে খুঁজে নিতে দেরি করেনি ক্যামেরার লেন্স। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের আশঙ্কা তখন রোনালদোর অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট।

সেই আতঙ্ক ও হতাশার রেশ কাটানোর দায়িত্বটা যেন নিজের কাঁধেই তুলে নেন রোনালদো। ৬০ মিনিটে দারুণ দক্ষতায় বল নিয়ন্ত্রণ করে চমৎকার এক ফ্লিকে জালে পাঠিয়েছিলেন।

.

তবে সহকারী রেফারি অফসাইডের সংকেত দেন। পরে ভিএআরেও সেই সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। বল জালে পাঠানোর পর দৌড়ে ‘সিউ’ উদ্যাপন করতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত করা হয়নি রোনালদোর। আতঙ্ক তো কাটলই না, আরও বেশি জেঁকে বসল। যদিও সেই আতঙ্ক স্থায়ী হলো মাত্র ৮ মিনিট।

.

৬৮ মিনিটে গোলের সুযোগ রোনালদোর পাতে তুলে দিল পেনাল্টির সিদ্ধান্ত। পেনাল্টি নিতে নিজের চিরচেনা ভঙ্গিতেই এগিয়ে যান তিনি। একদম মাঝ বরাবর শট নিয়ে গোলরক্ষককে ভুল দিকে পাঠিয়ে সহজেই বল জালে জড়ান। এরপর সম্পন্ন করেন সেই অসমাপ্ত উদ্যাপন—‘সিউ’!

.

গোলের পর রোনালদোকে ৮১ মিনিটে তুলে নেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। স্পষ্টতই কোচের সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারেননি ‘সিআর সেভেন’। এ সময় রোনালদোর মুখের অভিব্যক্তি ছিল বিরক্তি ও হতাশা। বেঞ্চে বসেও ক্ষণে ক্ষণে পাল্টেছে রোনালদোর মুখের অভিব্যক্তি।

.

ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে যা হয়েছে, তাতে রোনালদোর মুখ কিছু সময়ের জন্য পরিণত হয়েছিল বিখ্যাত মার্কিন আর্টিস্ট অ্যান্ডি ওয়ার হলের হরেক রঙের পেইন্টিংয়ে। ৯৪ মিনিটে গোল করেন গনসালো রামোস। বেঞ্চ থেকে ছুটে গিয়ে সতীর্থদের সঙ্গে উদ্যাপনে ভেসেছেন রোনালদো। এই গোলের পর শেষ বাঁশির অপেক্ষায় থাকা রোনালদোর মুখে ছিল স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ। কিন্তু নাটক যে তখনো অনেক বাকি!

.অবিশ্বাস্য নাটকীয়তার ম্যাচে রোনালদোর হাসি, মদরিচের বিদায়.

যোগ করা সময়ের ১৩ মিনিটের মাথায় রোনালদোকে হতভম্ব করে ফের গোল করে ক্রোয়েশিয়া। ক্রোয়েশিয়ার উদ্‌যাপনের বিপরীতে রোনালদোর চোখ তখন জলে ভাসার অপেক্ষায়। চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না, মুখ যেন শ্রাবণের আকাশ। এতটা হতাশ ও বিহ্বল রোনালদোকে কবে দেখা গিয়েছিল কে জানে! তবে সেই মেঘ কেটেছে এক লহমায়। রেফারি ভিএআর মনিটর দেখে জানালেন গোল বাতিল। সেই সিদ্ধান্ত ফিরল স্বস্তি আর একটু পর শেষ বাঁশি বাজতেই হাসি।

.

এই ম্যাচে রোনালদোকে এত বেশি আবেগের রোলারকোস্টারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, ম্যাচ শেষের পরও বিহ্বলতা যেন পুরোপুরি কাটল না। তাতে অবশ্য ভালোই হয়েছে। পরের ম্যাচের জন্য বাকি উচ্ছ্বাসটুকু না হয় জমা থাকল!

.মেসি-এমবাপ্পের দুটি লড়াই, কে কোনটিতে এগিয়ে