বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের মধ্যে ৯ মাসই দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। সদ্য বিদায়ী জুন মাসে ৩৩৯ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এতে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতের রপ্তানি ৪৭ শতাংশ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে ৪৬ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্যে ৭৬ শতাংশ, হোম টেক্সটাইলে ৬০ শতাংশ, প্রকৌশল পণ্যে ৪৪ শতাংশ ও প্লাস্টিক পণ্যে ৫৫ শতাংশ রপ্তানি বেড়েছে।
সার্বিকভাবে জুনে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪২০ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে টানা তিন মাস (এপ্রিল, মে ও জুন) ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়। এর আগে দুই মাসে একই পরিমাণ রপ্তানি হয়েছে। অন্য মাসগুলোয় ৩ বিলিয়নের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তবে গত ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে। শেষ পর্যন্ত বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৮ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল বৃহস্পতিবার পণ্য রপ্তানির হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। বিদায়ী অর্থবছরে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে গিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও বছর শেষে ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি কম হয়েছে।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারেনি। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশল পণ্য ও হিমায়িত পণ্যে প্রবৃদ্ধি আছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম দুই উৎস—পণ্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবণতা থাকলেও প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে দেশে।
রপ্তানিকারকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ভালোই ধাক্কা খেয়েছে। শুধু তা–ই নয়, ইউরোপের বাজারেও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। ইরান যুদ্ধ শুরু হলে সংকট আরও প্রকট হয়। সে কারণে তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি পণ্যের রপ্তানি কমেছে।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল।
গত অর্থবছর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৭ শতাংশ। মোট রপ্তানি হয়েছে ১২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। বিদায়ী অর্থবছর ১৩ কোটি ডলারের চামড়া, ৪০ কোটি ডলারের চামড়া পণ্য ও ৬৯ কোটি ডলারের চামড়ার জুতা রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চামড়া পণ্যে প্রবৃদ্ধি হয় ১৬ শতাংশ শতাংশ।
দেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি বিদায়ী অর্থবছরে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি হয়েছে ৯৭ কোটি ডলারের পণ্য। তার আগের বছর ৯৯ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছিল। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে চা, শাকসবজি, ফল, মসলা, শুকনা খাবার, পান, তেলবীজ ইত্যাদি।
হোম টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৯৩ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল পণ্য, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৮৭ কোটি ডলারের তুলনায় সাড়ে ৬ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ৪ শতাংশের মতো কমলেও বিদায়ী অর্থবছরে বেড়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ৮৮ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে পৌনে ৮ শতাংশ বেশি।
সব মিলিয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, নতুন ২০২৬–২৭ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি খুব বাড়বে—এমন প্রত্যাশার সুযোগ কম। কারণ, কিছু ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্ক বসাতে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। যুদ্ধ থামলেও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের বিক্রি কম।
মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক আরও বলেন, ‘দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট আছে। তা ছাড়া আমাদের মূল্যস্ফীতি আছে ১০ শতাংশের ঘরে, যা প্রতিযোগী দেশ চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার ৩-৪ শতাংশ। ফলে সেসব দেশের চেয়ে আমাদের প্রকৃত বিনিময় হার কম। তাতে আমাদের উৎপাদকেরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। সে জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানির জোগানের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমানোর পদক্ষেপ লাগবে।’






