ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে স্থানীয় সময় বুধবার দিবাগত রাতে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। রয়টার্স জানিয়েছে, এতে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। শহরের মেয়র এই হামলাকে কিয়েভের ওপর চালানো ‘সবচেয়ে বড় হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহত আরও একজনের মৃত্যু হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭ হয়েছে। এ ছাড়া এ হামলায় আহত হয়েছেন ৯১ জন।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো বিবিসিকে বলেন, হামলার শিকার হওয়া স্থানগুলোর মধ্যে একটি অ্যাম্বুলেন্স স্টেশনও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগের কিছু হামলায় প্রাণহানি বেশি হলেও এবারের হামলায় সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ব্যবহার করেছে রুশ বাহিনী। কিয়েভের অনেক বড় এলাকা জুড়ে এ হামলা চালানো হয়েছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপর হামলা শুরু হলে শহরের বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
.অবশ্য মস্কোর দাবি, রাশিয়ার বেসামরিক অবকাঠামোতে ইউক্রেনীয় হামলার জবাবে তারা কিয়েভের সামরিক কারখানায় এই হামলা চালিয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাশিয়া ‘কিয়েভ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা বজায় রাখবে’।
অন্যদিকে, রাশিয়ার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে ইউক্রেন অভিযোগ করেছে, মস্কো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেসামরিক এলাকাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তারা আরও বলেছে, আক্রমণকারী দেশ আর আত্মরক্ষাকারী দেশকে এক করে দেখা ভুল হবে।
কিয়েভ সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো বলেন, হতাহতদের একটি বড় অংশই শিশু। বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ আবারও জেনেশুনে আবাসিক এলাকাগুলোকে নিশানা করছে এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে।’
কিয়েভের মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত রাতে ৪ হাজার ৫০০ শিশুসহ প্রায় ৫২ হাজার ৫০০ মানুষ মাটির নিচের স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটিই সেখানে সর্বোচ্চ আশ্রয়ের রেকর্ড।
হামলার শিকার হওয়া স্থানগুলোর মধ্যে কিয়েভের দক্ষিণ-পূর্বের দারনিৎস্কি এলাকার একটি বহুতল আবাসিক ভবন রয়েছে। সেখানে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
.এর মধ্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি কিন্ডারগার্টেনের পাশে বিশাল গর্ত তৈরি করেছে। বিস্ফোরণের পর চারপাশের ভবনগুলো আগুনে পুড়ে গেছে এবং সেগুলোর লোহার বারান্দাগুলো দুমড়েমুচড়ে গেছে।
দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি সামান্য দূরে একটি নয়তলা আবাসিক ভবনের শেষ মাথায় আঘাত হানে। এতে ভবনটির সেই অংশটি ধসে কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানান, বেশ কয়েকজন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। হামলার সময় তারা হয়তো ভবনের মাটির নিচের কক্ষে (বেজমেন্ট) আশ্রয় নিয়েছিলেন।
ঘটনাস্থলে পড়ে আছে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ি ও জানালার ভাঙা কাচ। চারপাশের সবকিছুর ওপর জমে আছে ছাইয়ের ধূসর আস্তরণ। স্বজনদের কান্নার মাঝে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের পাশেই থাকেন স্ভিতলানা। তিনি বিবিসিকে বলেন, বিমান হামলার সময় তিনি ঘরের করিডোরে লুকিয়ে ছিলেন এবং একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।
.তবে এতে ভয় পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ভয় লাগেনি। কারণ আমি আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি।’ স্ভিতলানা জানান, অন্য একটি শহরে রাশিয়ার আরেকটি হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সেই হামলায় তার মা মারা যান। এর দুই বছর পর, ইউক্রেনের হয়ে যুদ্ধ করার সময় তার ছেলেও নিহত হন।
ওলেকসি নামের আরেক বাসিন্দা জানান, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শুনে তিনি ধূমপান করতে বাইরে এসেছিলেন। ঠিক তখনই দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি এসে পড়ে এবং উড়ে আসা কাচ লেগে তার মুখ রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।
রাশিয়ার ‘পাল্টা হামলা’র দাবি প্রত্যাখ্যান করে ওলেকসি বলেন, ‘এটি ইউক্রেনের হামলার কোনো প্রতিশোধ নয়। যুদ্ধটা তারাই শুরু করেছে। এটি একটি আবাসিক এলাকা এবং তারা জেনেশুনেই এখানে হামলা চালিয়েছে।’
এদিকে ইউক্রেনীয় রেড ক্রস জানিয়েছে, রাতের হামলায় তাদের একটি প্রধান গুদাম ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে প্রায় ১৩ লাখ পাউন্ড (৭ কোটি ৯০ লাখ ইউক্রেনীয় রিভনিয়া) মূল্যের ত্রাণসামগ্রী নষ্ট হয়েছে।
.সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার ত্রাণসামগ্রী নষ্ট হওয়ার কারণে পুরো ইউক্রেনে তাদের জরুরি সাহায্য ও মানবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
কিয়েভে এই হামলা চলে ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। হামলাটি চালানো হয় কয়েক দফায়। প্রথমে কিয়েভের ঐতিহাসিক এলাকায় ড্রোন হামলা করা হয়, যার ফলে শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি হোটেলে আগুন ধরে যায়।
এরপর ইউক্রেনের স্থানীয় সময় বুধবার দিবাগত রাত ১টার (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা) দিকে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে রাত ৩টার দিকে আরও বেশ কিছু ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। এরপর ভোর পর্যন্ত ড্রোনের দল একের পর এক রাজধানী লক্ষ্য করে আঘাত হানতে থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাবস্থার মধ্যে থাকা কিয়েভের বাসিন্দারা বলছেন, গত দুই মাসে রাশিয়ার হামলার ধরনে একটি পরিবর্তন লক্ষ করেছেন তারা। এখন হামলাগুলো হয়তো আগের চেয়ে কিছুটা কম ঘন ঘন হচ্ছে, তবে প্রতিটি হামলা আগের চেয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী, শক্তিশালী এবং আরও বড় এলাকা জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।






