অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহযোগিতায় ব্র্যাক ও মুক্তকণ্ঠের যৌথ উদ্যোগে ‘সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা, রুখতে হবে এখনই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৬ জুন ২০২৬ কক্সবাজারের সায়মন বিচ রিসোর্টে
.মো. নুরুল হক এমপি
প্রতিমন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
মো. আ. মান্নান
জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার।
ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
জোনাল কমান্ডার, পূর্ব জোন-চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড।
এ এন এম সাজেদুর রহমান
পুলিশ সুপার, কক্সবাজার।
সুরাইয়া আক্তার সুইটি
উপসচিব ও ক্যাম্প ইনচার্জ, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়, কক্সবাজার।
শরিফুল ইসলাম হাসান
সহযোগী পরিচালক, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম, ব্র্যাক।
রেজাউল করিম, সহযোগী পরিচালক ও অফিস ইনচার্জ, মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (এইচসিএমপি), ব্র্যাক।
আস্ট্রিড ক্যাসেলিন
সহকারী প্রতিনিধি (সুরক্ষা) জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)
লিটন কান্তি চৌধুরী
সহকারী পরিচালক, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, কক্সবাজার।
মোবারক হোসেন
সহকারী পরিচালক, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, কক্সবাজার
মো. শাহ জালাল
অধ্যক্ষ, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রামু, কক্সবাজার
মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম
রিজিওনাল হেড ও উপ–পরিচালক, ইপসা
বিশ্বজিৎ ভৌমিক
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি।
তারেকুর রহমান
ভুক্তভোগী
অং অং উ জুয়েল
ভুক্তভোগী
হামিদা ইয়াসমিন
সৌদি আরব ফেরত ভুক্তভোগী
মাহবুবুর রহমান
সভাপতি, কক্সবাজার প্রেসক্লাব।
মমতাজ উদ্দিন বাহারি
সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার প্রেসক্লাব।
আব্দুল কুদ্দুস রানা
স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার, মুক্তকণ্ঠ।
সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, মুক্তকণ্ঠ
.মো. নুরুল হক
এমপি, প্রতিমন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রঙিন ভবিষ্যৎ ও উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে। সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার এই চেষ্টা আমাদের রুখতে হবে এখনই। দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে জমিজমা বিক্রি করে, ধারকর্জ করে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে অনেকেই যাত্রা করছেন। কিন্তু এভাবে বিদেশ যাওয়ার সময় অনেকে প্রায়ই ভয়াবহ ঘটনার শিকার হন। দালালেরা তাঁদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। যাত্রাপথে তাঁদের ন্যূনতম খাবার কিংবা পানি পর্যন্ত দেওয়া হয় না। অনেকে মাঝপথে মারা যান। যাঁরা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের তীরে ভিড়তে পারেন, সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন।
আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছে অনুরোধ করব রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে। কারণ, এই সংকট এখন আমাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।
বিদেশগামীদের জন্য দেশে ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) রয়েছে, আমরা এগুলোর মান বাড়ানোর জন্য কাজ করছি।
সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা বন্ধে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি সচেতনতামূলক কাজে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিওর পাশাপাশি রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার, প্রশাসন, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমুদ্রপথে এবং অন্যান্য অবৈধ পথে বিদেশযাত্রার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে বলে আমি আশাবাদী।
.মো. আ. মান্নান
জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার
সাগরপথে বিদেশযাত্রার বিষয়টি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি অনেক বেশি আলোচনায় এসেছে। কক্সবাজার উপকূলে শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকায় এ সময় মানব পাচারের ঝুঁকিও বাড়ে। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যখন আমরা এ ধরনের মানব পাচারের তথ্য পাই, তখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু একটি বড় সমস্যা হলো, যেসব পরিবার তাদের সদস্যদের সমুদ্রপথে বিদেশ যেতে গিয়ে হারায় বা প্রতারণার শিকার হয়, তারা অনেক সময় ঘটনাটি স্বীকারই করতে চায় না। ফলে এই অপরাধের তদন্ত ও অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে মানুষকে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। সরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
অনেক মানুষ দেশে আয়-উন্নতির সম্ভাবনা দেখতে না পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। কেউ যদি দক্ষতা অর্জন করে দেশেই আয় করার সুযোগ পান, তাহলে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গৃহীত ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায় থেকে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। জেলা প্রশাসন কক্সবাজার সাগরপথে অবৈধ বিদেশযাত্রা বন্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর।
.ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
জোনাল কমান্ডার, পূর্ব জোন-চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড
কোস্টগার্ড সমুদ্রপথে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান ঠেকাতে নিরলসভাবে কাজ করছে। সংঘবদ্ধ এই অপরাধ ঠেকাতে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম ও সচেতন মানুষের মধ্যে তথ্য বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য ও আমাদের গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে আমরা পাচারকারীদের দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখি। কারণ, তথ্য পাওয়ার পর কোস্টগার্ড বা অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন ইউনিটকে সতর্ক করা হয়। পাচারকারীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এনে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে আসে। পরে রাতের অন্ধকারে সমুদ্রপথে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করা হয়।
এভাবে নৌকায় করে পাচারের সময় নারী ও শিশুদের পরিস্থিতি অত্যন্ত মানবেতর হয়। খাবার, বিশুদ্ধ পানি কিংবা শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। অনেক সময় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে এবং মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। তাই এই অপরাধ শুধু আইন ভঙ্গ নয়, মানবতার সঙ্গে চরম অবমাননা।
আমাদের উপকূলরেখা ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ। যেকোনো স্থান দিয়েই নৌকা নামানো সম্ভব। কিন্তু উপকূলে পর্যাপ্ত নজরদারি ব্যবস্থা, হেলিকপ্টার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
শঙ্কার বিষয় হলো, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা জেল থেকে বেরিয়ে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাই আইনগত প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি জেলে সম্প্রদায় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের ঝুঁকির বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শুধু কারিগরি প্রশিক্ষণ নয়, পর্যটন, হোটেল ব্যবস্থাপনা ও মৎস্য খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। সবার সহযোগিতা পেলে মানব পাচার প্রতিরোধে আমরা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারব।
.এ এন এম সাজেদুর রহমান
পুলিশ সুপার, কক্সবাজার
দালালের প্রলোভনে পড়ে মানব পাচারের শিকার হন মূলত সমাজের সেই মানুষেরা, যাঁরা বঞ্চিত, নিগৃহীত ও হতাশ। এই মানুষদের বাস্তবতা চিহ্নিত না করে শুধু আইন প্রয়োগ করে মানব পাচার বা অনিরাপদ অভিবাসন বন্ধ করা সম্ভব নয়। একজন মানুষ যখন জীবনে আর কোনো সম্ভাবনা দেখতে পান না, তখন তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। তাই সমস্যাটিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
কক্সবাজারে ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও জটিল। এখানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার আশ্রয় নেওয়া এবং উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পাচারকারীরা সহজেই মানুষকে প্রলুব্ধ করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলে অনেককে ফাঁদে ফেলা হয়। বেড়ানোর আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের ডেকে এনে পরে অপহরণ বা পাচার করা হয়। একইভাবে কিছু জেলে মনে করেন, মাছ ধরার চেয়ে মানুষ পাচার করে বেশি অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। ফলে এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার পরিবর্তন না এলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এই সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন। পিছিয়ে পড়া মানুষদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু সমুদ্রপথ নয়, আকাশপথ ও স্থলপথ দিয়েও অনিরাপদ অভিবাসনের ঘটনা ঘটছে। তাই সমস্যাটিকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
.সুরাইয়া আক্তার সুইটি
উপসচিব ও ক্যাম্প ইনচার্জ, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়, কক্সবাজার
২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে নিজ দেশে ফিরে নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিক জীবন পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে তাদের। এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও হতাশার কারণে অনেকেই জীবন বাজি রেখে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে।
শিবিরগুলোতে সীমিত আবাসন, নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষার অভাব, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বাংলাদেশিদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মধ্যেও সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রার প্রবণতা বেশি, বিশেষ করে কিশোরীদের।
রোহিঙ্গা কমিউনিটি শিক্ষার দিক থেকে অনেকটা অনগ্রসর হওয়ায় ধর্মীয় নেতা, মাঝি, কমিউনিটি প্রতিনিধি ও বিভিন্ন অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে যে রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক পুনর্বাসনের সুযোগও খুব সীমিত। তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে হবে। এ জন্য তাদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন করাও জরুরি।
তাই রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ও জীবিকার ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রবাহ অব্যাহত রাখা এবং মানবাধিকার বিপর্যয়ের একটি টেকসই সমাধানের দিকে সবার এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
.শরিফুল ইসলাম হাসান
সহযোগী পরিচালক, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম, ব্র্যাক
সাংবাদিক হিসেবে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সমুদ্রপথে মানব পাচার এবং থাইল্যান্ড–মালয়েশিয়া সীমান্তে গণকবরের ঘটনা নিয়ে আমি প্রতিবেদন করেছি। বিশ্বের অল্প কয়েকজন সাংবাদিকের একজন হিসেবে আমি সেই গণকবর দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে কবরগুলোর ওপর কোনো নাম ছিল না, ছিল শুধু নম্বর। কারণ, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। হয়তো পটুয়াখালী, ঝিনাইদহ বা কক্সবাজারের কোনো মা এখনো ভাবছেন তাঁর সন্তান মালয়েশিয়ায় আছেন, কিন্তু তিনি জানেন না তাঁর সন্তানের মৃত্যু হয়েছে এবং সে শুয়ে আছে গণকবরে।
সে সময় প্রায় এক লাখ মানুষ পাচারের শিকার হয়েছিল। আমি বহু বছর ধরে কক্সবাজারে সমুদ্রপথে মানব পাচার নিয়ে প্রতিবেদন করেছি। কিন্তু তখন অনেকেই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করেননি। ২০১৫ সালে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের হাত-পায়ে শিকল পরিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ছবি আমরা প্রকাশ করেছিলাম। তাঁদের মধ্যে অনেক কিশোরও ছিল। মানব পাচারে জড়িত প্রভাবশালীদের নিয়েও আমরা প্রতিবেদন করেছি, যার কারণে আমাদের সহকর্মী হামলার শিকার হয়েছিলেন।
দুঃখজনক হলো, ১১ বছর পরও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। এখনো মানুষের স্বপ্ন সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে, সীমান্ত এলাকায় লাশ পাওয়া যাচ্ছে এবং নারী ও শিশুদের উদ্ধার করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে বৈধভাবে কাজ করছেন এবং গত বছর তাঁরা ৩২ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। প্রতি মাসে গড়ে লাখখানেক মানুষ বৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছেন। তারপরও অনেক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ, বৈধ প্রক্রিয়া জটিল, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্রের নিয়ন্ত্রণে। বিদেশে যেতে বাংলাদেশিদের ব্যয় বিশ্বের অন্যতম বেশি অথচ তাঁদের আয় তুলনামূলক কম। ফলে অনেকেই অদক্ষ অবস্থায় ঋণ নিয়ে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়েন।
গত ১৬ বছরে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে আটক হয়েছেন। অনেকেই মনে করেন, অবৈধভাবে বিদেশে গেলেই জীবন বদলে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের অধিকাংশের পরিণতি হয় মৃত্যু, কারাবাস বা ফেরত আসা। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের আবেদন করে আছেন। মানব পাচার পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গা সংকট এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশকে ব্যবহার করে থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। গত এক দশকে প্রায় দুই লাখ মানুষ বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়েছেন এবং বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। দালালরা মালয়েশিয়া বা অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার প্রলোভন দেখালেও বাস্তবে অনেককে নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
আমরা চাই মানুষ বিদেশে যাক, তবে জেনে-বুঝে, দক্ষতা অর্জন করে এবং বৈধ পথে। এ লক্ষ্যে আমরা প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এ ছাড়া সারা দেশে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে অভিবাসনবিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করাও এখন খুবই জরুরি।
আমাদের স্লোগান হলো, ‘সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রাকে না বলুন’। এটি শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; পুলিশ, প্রশাসন, বিজিবি, কোস্টগার্ড, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
.রেজাউল করিম
সহযোগী পরিচালক ও অফিস ইনচার্জ, মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (এইচসিএমপি), ব্র্যাক
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা দিতে সুরক্ষা খাতের আওতায় ব্র্যাক উখিয়ার ১০টি এবং টেকনাফের ৬টি ক্যাম্পে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সেখানে ৫৫ জন আইনজীবী ও আইন কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন। তাঁরা আইনি সহায়তা, পরামর্শ, প্রাথমিক মনঃসামাজিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে পাচারের শিকার ও সারভাইভারদের সহায়তা করছেন। কমিউনিটি রেডিও এবং ক্যাম্পভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গার কাছে মানব পাচার প্রতিরোধ–সংক্রান্ত সচেতনতা বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।
দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিলেও রোহিঙ্গাদের সবার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যাচ্ছে না। বাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং জীবিকার সুযোগ না থাকলে এসব উদ্যোগের সুফল সীমিত থাকে। মানব পাচার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় ব্লক ও উপব্লক পর্যায়ে কমিটি গঠন, সাক্ষীদের জন্য আরও সহায়তা বৃদ্ধি করা এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণেই মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান রোধ করা সম্ভব।
.আস্ট্রিড ক্যাসেলিন
সহকারী প্রতিনিধি (সুরক্ষা), জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)
বাংলাদেশে বর্তমান শরণার্থী পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। শুধু ২০২৩ সালে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রার সময় প্রায় ৫ হাজার ৭৮৭ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ নারী ও শিশু। ইউএনএইচসিআর তথ্য অনুযায়ী, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ৩৯ শতাংশ নারী এবং ৫০ শতাংশ শিশু। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অর্ধেক রোহিঙ্গা এবং অর্ধেক বাংলাদেশি নাগরিক।
২০২৬ সালের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পের জীবনযাপন ও নিরাপত্তাহীনতা অনেককে সমুদ্রপথে যাত্রায় উৎসাহিত করছে। মানব পাচার মোকাবিলায় সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করতে হবে।
রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। আমরা বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ক্যাম্পে থাকা এই মানুষদের বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে, যাতে তারা বাংলাদেশের ওপর থাকা এই বড় দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। একই সঙ্গে মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক চাপও জরুরি।
.লিটন কান্তি চৌধুরী
সহকারী পরিচালক, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, কক্সবাজার
কক্সবাজার জেলা থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ বিদেশে গেছেন। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিদেশে গেছেন ৩ হাজার ৮ জন এবং তাঁদের মধ্যে ৪০২ জন নারী। কক্সবাজারে নারী অভিবাসীর সংখ্যা তুলনামূলক কম।
অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থার আওতায় বিএমইটি ও কক্সবাজার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে জমা পড়া প্রায় ৩০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ অভিবাসনে উৎসাহ দিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। সভা, সেমিনার, গণমাধ্যমে প্রচার এবং প্রচারপত্র বিতরণের মাধ্যমে নিয়ম মেনে বিদেশ যেতে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। চকরিয়ায় বিদেশযাত্রার আগে প্রাক্-সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
অনিরাপদ অভিবাসন প্রতিরোধে জেলা অভিবাসন সমন্বয় কমিটি এবং জেলা ভিজিল্যান্স টাস্কফোর্স কমিটি সক্রিয় রয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও একই ধরনের কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল পেলে এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
.মোবারক হোসেন
সহকারী পরিচালক, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, কক্সবাজার
পাসপোর্ট করার প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং তথ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক বিদেশগামী মানুষ জানেন না। ২০২০ সালে ই-পাসপোর্ট চালুর পর জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনলাইনে যাচাই ছাড়া পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব নয়। আগে যেসব সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ কেউ একাধিক পাসপোর্ট করতে পেরেছিলেন, এখন তা সহজেই শনাক্ত হচ্ছে।
কেউ কেউ প্রথমে ভুল তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট করেন, পরে আবার তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে সবার সচেতনতা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পরিপত্র অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যই পাসপোর্টের মূল ভিত্তি। ফলে তথ্যের অসংগতি থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে তথ্যের অসংগতি পাসপোর্টের আবেদনের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
পাসপোর্টের আবেদনের সময় রোহিঙ্গা–সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা বিভিন্ন উপায়ে তথ্য যাচাই করি। তবে তথ্যভান্ডারগুলো পাসপোর্ট–ব্যবস্থার সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে যুক্ত করা গেলে যাচাই করা সহজ হবে। এতে মানব পাচারের ঝুঁকিও কমে আসবে।
.মো. শাহ জালাল
অধ্যক্ষ, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র রামু, কক্সবাজার
রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে আমাদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। কক্সবাজারের রামু কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তিন মাস মেয়াদি বিভিন্ন কারিগরি কোর্সও চালু আছে। বিদ্যুৎকাজ, গৃহপরিচর্যা, কম্পিউটার গ্রাফিকস ডিজাইন, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও রেফ্রিজারেশন, অটোমোবাইল মেকানিকসসহ বিভিন্ন বিষয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার কেন্দ্রও কক্সবাজারে চালু হয়েছে। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেলে সে দেশে চাকরি পাওয়া সহজ হয় এবং বেশি বেতন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এ পর্যন্ত ২৭ হাজার বিদেশগামী কর্মীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের অনেকের মধ্যেই প্রয়োজনীয় আগ্রহের অভাব রয়েছে। এমনকি অনেকে ইংরেজি পড়তেও পারেন না। তাই বিদেশ যাওয়ার আগে দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান অর্জনের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
.মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম
রিজিওনাল হেড এবং উপপরিচালক, ইপসা
নিরাপদ অভিবাসন বলতে শুধু বিদেশে যাওয়া নয়, পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে বিদেশে কর্মসংস্থান এবং বৈধ পথে দেশে অর্থ পাঠানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করতে হবে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে, একই সঙ্গে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত হবে।
মানব পাচার প্রতিরোধে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কাউন্টার ট্রাফিকিং কমিটিগুলোকে সক্রিয় করা জরুরি। বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এসব কমিটির নিয়মিত সভা ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রপথে অবৈধ বিদেশযাত্রা কমবে।
পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষদের পুনর্বাসন তুলনামূলক সহজ হলেও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে নারী সারভাইভারদের সমাজ ও পরিবারে পুনরেকত্রীকরণ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারি প্রতিষ্ঠান, পাসপোর্ট অফিস এবং মানব পাচারবিরোধী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়ে একত্রে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে পারলে মানুষ বৈধ পথে বিদেশ যাবেন এবং দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবেন।
.বিশ্বজিৎ ভৌমিক
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি
কক্সবাজার থেকে শুধু সমুদ্রপথে নয়, আকাশপথেও অনেক মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন। তাঁদের পাসপোর্ট, ভিসা, বিএমইটি কার্ডসহ প্রয়োজনীয় কাগজ থাকে। কিন্তু অনেককে ৯০ দিনের ভিসায় বিদেশে পাঠানো হয়। এই ভিসায় বিদেশে গিয়ে পরে তাঁরা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি কিংবা কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ না পেয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে তথ্যভিত্তিক অভিবাসনব্যবস্থা নিয়ে আমরা কাজ করছি। বর্তমানে আমরা কক্সবাজার আদালতে প্রায় ১০০ জন বিদেশফেরত ব্যক্তির মামলা পরিচালনা করছি। এ ছাড়া মানব পাচার–সংক্রান্ত প্রায় ৪৬৫টি মামলা বিচারাধীন। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে মানব পাচার রুখতে শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা নয়, বরং প্রতিরোধের কার্যকর উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কার্যক্রম পরিচালনারত সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সমন্বয়ের অভাবে যাঁরা কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে যাচ্ছেন, তাঁরা নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
.তারেকুর রহমান, ভুক্তভোগী
সহজে মালয়েশিয়ার ভিসা পাওয়া যাবে, এই প্রলোভন দেখিয়ে দালাল আমাদের মহেশখালী থেকে মিয়ানমারে পাচার করে দেয়, যেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই আমাদের ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। প্রথমে নির্মম মারধর করে পরিবার থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে আমাদের অন্য একটি গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে আমাদের নির্যাতন করা হতো, আমাদের জীবননাশের হুমকি দেওয়া হতো।
নির্যাতনের মুখে ঘরবাড়ি বিক্রি করে পাচারকারীদের টাকা দিতে আমরা বাধ্য হই। অথচ এত টাকা দেওয়ার পরও তারা আমাদের ঠিকমতো খাবার দিত না, অনেক সময় টানা তিন-চার দিন পর কিছু খেতে দিত। পরে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আবারও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে আমাদের সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু সেখানে আমরা ধরা পড়ে মিয়ানমারের কারাগারে প্রায় সাত মাস বন্দী থাকি। দুঃখের বিষয় হলো, সেই চরম সংকটের সময়ে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আমরা তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি এবং শেষ পর্যন্ত পরিবারের পাঠানো টাকায় কোনো রকমে জীবন বাঁচিয়ে আমরা দেশে ফিরতে পেরেছি।
.অং অং উ জুয়েল, ভুক্তভোগী
মালয়েশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া যেতে চেয়েছিলাম। বৈধভাবে যাওয়ার জন্য যে ভাষার পরীক্ষা দিতে হয়, সেগুলোর খরচ বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। দালালেরা সহজ পথে, কম খরচে পাঠানোর আশ্বাস দেওয়ায় স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করি। পরে বুঝতে পারি, আমরা মিয়ানমারে ঢুকে পড়েছি। কয়েক দিন পাহাড় পেরিয়ে হাঁটার পর আমাদের আটক করা হয়। এক মাস রিমান্ডে এবং পরে কয়েক মাস কারাগারে থাকতে হয়। সেই সময়ে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না।
অনেক কষ্টে মিয়ানমারের এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে দেশে মায়ের কাছে চিঠি পাঠাতে সক্ষম হই। পরে জানতে পারি, দালালেরা আমার পরিবারের কাছ থেকেও আমাকে উদ্ধারের খরচ হিসেবে টাকা নিয়েছে।
থান্ডওয়ে কারাগারে বন্দী থাকার সময় যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের অন্যত্র নিয়ে জোর করে নানা কাজ করতে বাধ্য করা হয়। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরি।
.১. মানব পাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
২. তৃণমূল পর্যায়ে সারা দেশে অভিবাসন ও মানব পাচারবিষয়ক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা।
৩. মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে অভিবাসন এবং মানব পাচার বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
৪. মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গৃহীত ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।
৫. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সীমান্ত ও উপকূল রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম ও জনবল দিয়ে শক্তিশালী করা।
৬. বিভাগীয় শহরগুলোর পাশাপাশি পাচারপ্রবণ জেলাগুলোয় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।






