আমি রুবামা রহমান। বাবার আদরের সুকন্যা। বাবা নিজেই আমার এই নাম রেখেছে। বাবা সংক্ষেপে আমাকে ‘রু’ বলে ডাকে। ফরাসি ভাষায় ‘রু’ (Rue) শব্দটির অর্থ হলো রাস্তা বা পথ। এটি একটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ। কেন আমাকে সে নামে ডাকে, তা আমি আজও জানতে পারিনি।
জানি না বাবা আমার মনের ভেতর তেমন কোনো সহজ–সরল রাস্তা দেখতে পায় কি না।
বাবা আমাকে বেশির ভাগ সময়ে মা বলে ডাকে। আমি বলি আচ্ছা বাবা, তোমার মা অর্থাৎ আমার দাদি যদি শুনত আমাকে মা বলে ডাকছ, তাহলে তিনি কী মনে করতেন?
বাবা বলে, তোমার দাদি বেঁচে থাকলে তোমাকেও আদর করে মা বলেই ডাকত বলত।
আমার জন্ম ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি ২১।
২১ নম্বরটা না কি বাবার অনেক পছন্দের। আমারও তাই।
বাবার এসএসসি পরীক্ষার রোল নম্বর ছিল ৮২১।
বাবা আমাদের জন্য প্রথম যে বাড়িটি কানাডায় এসে কিনেছিল, সেটার স্ট্রিট নম্বরও ছিল কাকতালীয় ভাবে ১২১। অর্থাৎ জানুয়ারি ২১।
১৯৯৯–এর এই জানুয়ারির ২১ তারিখে আমার জন্ম হয়েছিল ঢাকাস্থ ধানমন্ডির ৬ নম্বরে অবস্থিত ‘দ্য মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে’। আমি একজন সিজারিয়ান বেবি। মা তখনো অস্ত্রোপচার কক্ষে। আমার জন্মের পর নার্স তোয়ালে পেঁচিয়ে বাইরে অপেক্ষারত বাবা, আমার প্রিয় খালা ও খালাত বোনকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কী বাচ্চা চাও? ছেলে নাকি মেয়ে।
.বাবা ও আমার খালাত বোন জেসি বলেছিল, মেয়ে চাই। নার্স বলেছিল এই নাও!
আমার বাবার মাথায় খেয়াল চাপে বিদেশে লিগ্যাল ওয়েতে পাড়ি দেওয়ার। তাই আমার জন্মের অনেক আগে থেকে বাবা চেষ্টা করে যাচ্ছিল স্কিল্ড ক্যাটাগরিতে বিদেশ যাওয়ার।
বাবা আমাকে তাই বলে তুমি ‘লাকি ল্যাশ’।
তোমার জন্মের পরই আমরা ইন্টার্ভিউ পাই এবং আমাদের ভিসা হয়।
আমার জন্মের মাত্র ১৯ মাসের মাথায় আমরা সপরিবারে কানাডায় পাড়ি দিই।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিশাল ঢাউস এক বিমানে চেপে আমি আমার সাড়ে তিন বছর বয়সের বড় ভাই ও মাসহ টরন্টোতে থিতু হই ২০০০ সালের আগস্টে।
সেই লম্বা পথে বিমানে ১৯ মাস বয়সি আমি নাকি ভীষণ কান্নাকাটি করেছিলাম।
আমার কান্না থামাতে বাবা আমাকে কোলে করে ঘাড়ে আমার মাথা রেখে উড়ন্ত বিমানের একদম পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।
আমরা কানাডায় আসার একবছরের মাথায় আমার দাদি এসেছিলেন আমার চাচার সঙ্গে আমাদের দেখতে। দাদির সঙ্গে আমার সেই ছিল ভাসা ভাসা স্মৃতি।
দেশে ফেরার সময় দাদিকে বিদায় দিতে গিয়ে বাবা অনেক কেঁদেছিল। আমি বড় হয়ে শুনেছিলাম। দাদির সঙ্গে সেটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা।
দেশে ফেরার কয়েক মাসের মাথায় দাদি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। বাবা অনেক কষ্ট পেয়েছিল আর অনেক কেঁদেছিল।
.২.
ছোট বেলায় আমার মনে হতো বাবা খুবই রাগী একজন মানুষ।
কিন্তু যতই দিন যেতে থাকল, বুঝলাম না বাবা একজন সহজ–সরল খেয়ালি মানুষ।
মনে কখন কী উদয় হয়, তা–ই করে।
এরপরে একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম। গেলাম কিন্ডার গার্টেনে, তারপর জুনিয়র স্কুল হয়ে মিডল স্কুল শেষ করে হাইস্কুল। পরিশেষে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু। আমার বড় ভাই ও আমি দুজনে একই ইউনিভার্সিটিতে ছিলাম। বাবার কড়া শাসনে আমরা লেখাপড়া ভালো করে করতাম।
বাবা বলে আমাদের অধ্যয়নকালে নাকি প্রায় ৩০০ বারেরও অধিক ড্রাইভ করে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুর ক্যাম্পাসে গেছে।
পিক আপ ও ড্রপ অফ করতে। কখনো খাওয়ার জিনিস পৌঁছে দিতে।
বাবা মিউজিকে আসক্ত। সংগীতশিল্পী কিশোর কুমারের ভীষণ ভক্ত ।
ড্রাইভ করলে কিশোর কুমারের বাংলা ও হিন্দি গানগুলো প্রায় বাজত আমাদের গাড়িতে।
বাবা আমার ভাইকে পিয়ানো আর আমাকে বেহালা বাজানোর স্কুলেও ভর্তি করলেন মিউজিক শেখার জন্যে।
ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর আমি চাকরি পেতে অনেক স্ট্রাগল করছিলাম।
.দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected].
বাবা খুবই দুশ্চিন্তা করত। আর বকাও দিত।
বলত রিজুমি পাঠাও সবখানে। চেষ্টা করো ভীষণভাবে।
বলত ডেইলি কমপক্ষে ৫০টা রিজুমি পাঠাও।
পরিশেষে আমার চাকরিটা হলে বাবা অনেক অনেক খুশি হলো।
সিলভার স্পুন রেস্তোরাঁ থেকে আমাদের সবার জন্য অনেক খাবার অর্ডার করল।
সবাই মজা করে খেলাম।
বাবা ২০০০ সালে যখন এই দেশে অভিবাসিত হন, তখন এখানে চাকরির খুব ক্রাইসিস ছিল। বাবা তাই এখানকার ইউনিভার্সিটি গিয়ে নিজেকে কিছুটা আপগ্রেড করে।
পরে আল্লাহ মেহেরবানে বাবা ফেডারেল গভর্নমেন্টের পাবলিক সার্ভিসেসে যোগ দেয়।
২০ বছর কানাডা রেভিনিউ এজেন্সিতে চাকুরে করে সম্প্রতি রিটায়ার্ড করেছে।
এই অবসরকালীন সময়ে বাবা এখন ফুরফুরে মেজাজে থাকে।
মায়ের সঙ্গে আর রাগারাগি খুব একটা করে না।
বাবা বই পড়তে পছন্দ করে।
এই গুণটা আমি বাবার কাছ থেকেই পেয়েছি। আমি আবার বই কিনতেও পছন্দ করি।
বাবা আমার জন্যে বই রাখতে দুই দুইটা বুকশেলফ কিনে দিয়েছে।
.বাবার আরেকটা সখের বিষয় হলো বাগান করা। গাছপাগল মানুষ। ফ্রন্ট ইয়ার্ডে ফুলের গাছে ভরা। বাগানের ব্যাপারে পয়সা খরচ করতে একটু চিন্তা করে না। আমাদের নতুন বাড়িতে ওঠার আগেই ফ্রন্ট ইয়ার্ডে টিউলিপ বাল্ব লাগানোর জন্য কেনা সাড়া।
তারপর বাড়িতে উঠেই ২০০ ডলার দিয়ে চেরি ব্লসসম গাছ কিনে ফ্রন্ট ইয়ার্ডে লাগালেন। বাবা প্রত্যেক সামারে লাউ চারা গ্রো করে বাংলাদেশি দোকানে ও মার্কেটপ্লেস এ বিক্রয় করে মানি রেইজ করে থাকে এবং সেই অর্থ ডোনেট করে বাংলাদেশি অসহায় ও দুস্থ মানুষদের মধ্যে। আর সব রকমের শাকসবজি ফলায়ে আত্মীয়স্বজন ও বাংলাদেশি বন্ধুদের মধ্যে বিতরণ করে থাকে।
আমি বাবাকে বাগানের কাজে স্বল্প পরিসরে হেল্প করে থাকি। নিদেন পক্ষে কিছু না হলেও গাছে পানি দেই আর কাঠবিড়ালি, গ্রাউন্ডহগ ও খরগোশ এর উপদ্রব থেকে রক্ষা করার নিমিত্তে বাগান পাহারা দিই।
বাবার অবসর জীবন ভালো কাটলেও বয়স ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বাবা এখন দাড়ি রেখেছে। ডায়াবেটিস আছে বাবার। সেই আগের মতো আর এনার্জি পায় না।
আমি বাবার পুরানো ফটো দেখি আর বলি আমি আগের বাবা চাই।
সেই ছোট্ট বেলায় যেমন দেখেছি তেমন বাবাকে।
বাবা হাসে আর বলে আমিও সেই আগের ছোট্ট ‘রু’কে চাই।
যেমন তুমি ছোট্ট মিষ্টি একটা সিন্ড্রেলা ছিলে!
.এই কিছুদিন আগে আমার খেয়ালি বাবা আমাকে একগাদা অগ্রিম বার্থডে কার্ড দিয়েছে, ২০২৭ হতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত। ১৪ টা কার্ড একসঙ্গে।
বলেছে প্রত্যেক বছরের ২১ তারিখে তোমার জন্মদিনে শুধু একটা করে খুলে দেখতে।
আগেভাগে সব কটি খুলতে মানা করেছে।
২০২৯ সালে আমি তিরিশ আর ২০৩৯ সালে আমি চল্লিশ বছরের ‘রু’ হব। মনে প্রশ্ন হয় আমার,
তাহলে তখন কি বাবা থাকবে না?
বাবা কেন এত এডভান্স বার্থডে কার্ড দিল আমাকে?
আমি বলি বাবা তুমি কি ২০৩৯ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থাকবে না? যখন আমি চল্লিশ হব?
বাবা বলে, হায়াত ময়ুতের কথা কি বলা যায় মা। আল্লাহ্ হায়াত রাখলে থাকব ইনশা আল্লাহ।
আর না থাকলেও মনে কষ্ট নিও না।
যখন তুমি বাবাকে মিস করবে, তখন শুধু রাতের দূর আকাশ পানে একটু চেয়ে দেখবে।
দূরের অসীম আকাশে অনেক তারার মাঝে খুঁজতে থাকবে বাবাকে।
আর মনে করবে বাবা তো আকাশের তারার মতোই।
কখনো দেখতে পাবে আবার কখনো দেখতে পাবে না।
কিন্তু মনে রাখবে বাবা সব সময় তোমার সঙ্গেই আছে এবং তোমাকেই দেখছে। সেই আগের মতোই।
*লেখক: রানা টাইগেরিনা, টরেন্টো, কানাডা






