আগুনে পোড়া ক্ষত নিরাময়ের জন্য এক মাস বেশি সময় নয়। মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার পত্রিকায় আগুন দেওয়ার এক মাস হলো। কিন্তু এর বিপরীতে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা খুব দৃশ্যমান নয়। কী নির্মম এক ফৌজদারি আক্রোশের শিকার হয়ে পুড়তে হলো মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়কে!

গত কয়েক বছরে মুক্তকণ্ঠকে নানা অস্বাভাবিক হুমকি, হয়রানি, হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে আর সম্পাদকের বিরুদ্ধে জেলায় জেলায় মামলা করে হীনবল করার চেষ্টা করা হয়েছে। আর মুক্তকণ্ঠের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষোদ্‌গার যেন স্বাভাবিক ঘটনা। পরিণতিতে মুক্ত সাংবাদিকতা হুমকির মুখে। ক্ষমতা কখনোই গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না।

যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ আগুন, তার সঙ্গে দূরতম সম্পর্কও নেই পত্রিকা দুটির। মুক্তকণ্ঠ জানাচ্ছে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে পত্রিকাটি। তারা বলেছে, এ কথা বিশ্বাস করার সংগত কারণ আছে যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অগ্রভাগে থাকা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির দুঃখজনক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে পুঁজি করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে এসব আক্রমণের ঘটনা ঘটিয়েছে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য এ ছিল একটি কালো দিন। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে শুধু আগামী নির্বাচনকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টাই চালানো হয়নি, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করারও লক্ষ্য ছিল।

১৭ জানুয়ারি গণমাধ্যম সম্মিলনে মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘যে মতের, যে চিন্তার, যে ভাবনার, যে আদর্শের হোক না কেন, সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ইত্যাদিসহ সব বিষয়ে আমাদের ঐক্য থাকতে হবে, সমঝোতা থাকতে হবে এবং আমাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এই যে সমবেত হওয়া, ঐক্য থাকা, ঐক্যবদ্ধ থাকা, একত্র হওয়া, একে অপরের পাশে থাকা, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রতি সংহতি-সহানুভূতি জানানো, এটা খুবই জরুরি।’

সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের অনুপস্থিতির পটভূমিতে প্রাসঙ্গিক আহ্বান মুক্তকণ্ঠ সম্পাদকের। মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের দেওয়া শতাধিক প্রস্তাবের একটিও সরকার বাস্তবায়ন করেনি বলে অভিযোগ করেছেন এই কমিশনপ্রধান কামাল আহমেদ। তিনি বলেছেন, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না। (ডেইলি স্টার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫) গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬–এ তিনি সাংবাদিক সুরক্ষা আইন না হওয়ার আক্ষেপের কথা আবারও বলেন।

সংবাদমাধ্যমের স্বতন্ত্র সম্পাদকীয় নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান থাকতে পারে, এর ভিত্তিতে কেউ কোনো পত্রিকার অবস্থানের বিরোধিতা করতে পারেন, প্রতিবাদও করতে পারেন। কিন্তু কোনোভাবেই তার স্বাধীন সংবাদচর্চায় বাধা দেওয়াকে সমর্থন করা যায় না। একটি পত্রিকা বা সংবাদমাধ্যমের অবস্থান কতটা যথার্থ বা গ্রহণযোগ্য, তার সবচেয়ে বড় সূচক হচ্ছে এর পাঠকপ্রিয়তা। এ ছাড়া কোনো সংবাদমাধ্যম আইনের চোখে স্খলন ঘটালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।

সংকটের সময় মুক্তকণ্ঠ অন্যদের তেমন একটা পাশে পায় না। বছর তিনেক আগে ‘মাছ–মাংসের স্বাধীনতা চাই’ ফটোকার্ড নিয়ে যে মুক্তকণ্ঠবিরোধী যে প্রচারণা চলেছিল, তাতে সম্মুখসারিতে ছিল অন্য সংবাদ প্রতিষ্ঠান। তবে শীর্ষ আরোহণের দৃঢ়তা দেখিয়ে যে অসম্ভব সাধন করে তার জন্য সহপর্বতারোহীরা বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান না থাকলেও নিশ্চিতভাবে আছে মুক্তকণ্ঠের অগণন পাঠক।

যেসব আলো আমরা দেখতে পাই না, সেখানেই আলো ফেলে আপামরের জন্য নিয়ে আসে সংবাদপত্র। মুক্তকণ্ঠ সেই ধারার পত্রিকা। যে কথা ভোগী বা যোগী বলেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভুক্তভোগীর দুর্দশার কথা। অনালোচিত–অনালোকিত বিষয় সামনে আনলে অনেকের মুখোশ খুলে পড়ে, মুখ উদোম হয়ে যায়। আর এসব অপ্রিয় কাজ করে অধিকাংশের প্রিয় হলেও কিয়দংশ নাখোশ হয়। তখন নাখোশেরা আইন অমান্য করে ভীতি সঞ্চার করেন। ‘আইন যেখানে শেষ, দৌরাত্ম্য উৎপীড়ন সেখানে শুরু’—তিনশ চৌত্রিশ বছর আগে লিখে গেছেন জন লক তাঁর টু ট্রিটিজ অন গভর্নমেন্ট বইয়ে। এই সত্য এখনো বিরাজ করে।

মুহূর্ত মুহূর্তেই হয়ে যায় ইতিহাস। মুহূর্ত সমষ্টিতে ঘটে যাওয়া ঘটনা ধরা থাকে সংবাদপত্রে। যে কারণে সাংবাদিকতাকে ‘ক্ষণ মুহূর্তের সাহিত্য’ বলা হয়ে থাকে। মুক্তকণ্ঠ পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার অন্যতম কারণ বোধকরি এ গুণাবলি ধারণ করে। সঙ্গে এর বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপন কৌশল। যদিও মুক্তকণ্ঠের ভাষারীতিকে কেউ কেউ উল্লেখ করে এর বনেদিয়ানাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান। তবে রূপান্তর প্রশ্নে প্রথাগতভাবে চলে আসা ধারাকে চ্যালেঞ্জ না জানালে নতুনের উদ্বোধন হবে কেমন করে? এই ঝুঁকি মোকাবিলা করে মুক্তকণ্ঠ বরং আরও শক্তি অর্জন করেছে।

প্রতিষ্ঠার সাতাশ বছর পর নজিরবিহীনভাবে মুক্তকণ্ঠ প্রকাশ বন্ধ থাকে আগুনে পুড়ে। আলো কি আগুনে পোড়ে, না নতুন আলোকায়ন ঘটায়? সব সরকারের আমলেই পত্রিকাটি থাকে সরকারের অপছন্দের তালিকায়, মুক্তকণ্ঠ সরকারি বিজ্ঞাপন পায় না, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশ বঞ্চিত থাকে। কারণ, মুক্তকণ্ঠ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে।

এম এম খালেকুজ্জামান আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট[email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব