দক্ষিণ নাজিরপুরের ছোট্ট গ্রামে শান্ত স্নিগ্ধ সন্ধ্যা নদী বয়ে যেত। বর্ষায় নদী উচ্ছ্বসিত হয়ে চারপাশ জুড়ে পানি আর সবুজের সমারোহ সৃষ্টি করত। এই শ্যামল পরিবেশেই আমার শৈশব কেটেছে। মনের গভীরে এখনো সেই সময়ের অনেক স্মৃতি জাগরিত। তার মধ্যে মাছ ধরার আনন্দময় স্মৃতিগুলো সবচেয়ে প্রিয়।
বড়শি, জাল, চাঁই—নানা উপায়ে মাছ ধরতাম। ভাটায় খাল শুকলে চাঁই বসাতাম। চাঁইয়ের দু'পাশে নারিকেল বা খেজুর পাতা দিয়ে ঘিরে রাখতাম, যাতে মাছ পাতায় আটকে চাঁইয়ে ঢোকে। জোয়ারে মাছ ঢুকত, ভাটায় তুললে ছটফটানির শব্দে মন ভরে যেত। আহ, কী আনন্দ ছিল!
সবচেয়ে বেশি লাফাত চিংড়ি মাছ। তবে মাঝেমধ্যে চাঁইয়ে অবিষধর ঢোঁড়া সাপ বা মাছুয়াপোনা সাপও উঠত। তখন ভয়ও লাগত খুব। তাই চাঁইয়ের এক কোনা সাবধানে ধরে তুলতাম।
বাড়ির সামনের লম্বা খালে জাল টানতাম। জালে বেলে, টাকি, নুন্দি, ডগরি, শোল আর চিংড়ি বেশি পড়ত। কিন্তু পুকুর বা খালের পানি সেচে কাদায় মাছ ধরার মজা ছিল আলাদা। মাছ কোথায় থাকতে পারে আন্দাজ করে পানি সরিয়ে কাদায় হাত ঢুকিয়ে তুলতাম। প্যাক কাদা হাতড়ে মাছ বের করার সেই আনন্দ ভাষায় বলা যায় না।
শিং মাছ কাদার গভীরে লুকাত। গ্রামে এটাকে বলা হতো ‘হাইত্তা’। তন্নতন্ন করে খুঁজতে হতো। মাঝে মাঝে কাঁটায় আঙুল ফুলে যেত।
একবার মাছ ধরতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ি। মাছ তুলে দেখি পা বেয়ে রক্ত পড়ছে। পরে খুঁজে দেখা গেল, গোপনাঙ্গে জোঁক লেগেছে! লবণ দিয়ে ছাড়ানো হলো। কিন্তু রক্ত বন্ধ হয় না। ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। সে কী লজ্জা! এখনো মনে পড়লে হাসি পায়, আবার অদ্ভুত অনুভূতিও হয়।
বর্ষায় কেঁচো গেঁথে খালে চিংড়ি ধরতাম। একবার বিশাল চিংড়ি পড়ে গ্রামে আলোচনা হয়—‘অমুকের ছেলের বড়শিতে বড় চিংড়ি ধরা পড়েছে!’ তখন মনে হতো আমি মহান শিকারি। তবে বড়শিতে তেলাপিয়া সহজে পড়ত। দক্ষিণ নাজিরপুরের বড় ভাইয়েরা মসজিদের পুকুরে তেলাপিয়া চাষ করতেন। আমি আর স্বপন আটা গেঁথে বড়শি ফেলতাম, একের পর এক বড় তেলাপিয়া উঠত।
বর্ষায় পুকুর ডুবে যেত। অন্যের পুকুরের মাছ আমাদেরটায় আসত। একবার বড়শিতে বিশাল রুই ধরেছিলাম। সেই আনন্দ ভুলিনি। তবে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল শোল ধরা। পুকুরে বিশাল শোল ছিল, মাথা তুলে ডুব দিত। সবাই দেখত, কেউ ধরতে পারত না। সোহরাব ভাইজানের সঙ্গে দশবার চেষ্টায় ধরি। পুকুরের ঘাটের নিচে গর্তে তার আস্তানা ছিল। ধরার পর মনে হলো পৃথিবী জয় করেছি!
সন্ধ্যা নদীর ওপারে চরে আমি, হেলাল, ফিরোজ, কামাল, লিটন, শাহিন, মহিউদ্দীন—সবাই নৌকায় জাল নিয়ে যেতাম। দুষ্টুমি করতাম, অন্যের চাঁই থেকে মাছ চুরি নিতাম।
একবার আমি, রাজীব আর রানা ছোট নৌকায় চরে যাই। হঠাৎ নৌকা ডুবে যায়। সাঁতরে পাড়ে উঠি। তাড়াহুড়ায় একজনের লুঙ্গি স্রোতে ভেসে যায়। নদীতে প্রচণ্ড স্রোত, আর নৌকা অন্যের—অনুমতি ছাড়াই নিয়েছিলাম!
গ্রামের বড় ভাইয়েরা রাতে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন। তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছে করত, কিন্তু নিতেন না। মন খারাপ হতো।
খলিল ভাই আর সোহরাব ভাই ছিলেন মাছ ধরার বিশেষজ্ঞ। পুকুরের পানি দেখে বলে দিতেন মাছ আছে কি না, কী মাছ। তাঁদের কথা বেশিরভাগ সত্যি হতো।
গ্রামের বয়স্করা জাল বুনতেন—পাঁচ হাত, সাত হাত, নিখুঁত ফাঁস। হাটে জাল, চাঁই বিক্রি হতো। আমার বড় ভাই শখ করে সাত হাত জাল কিনেছিলেন, কিন্তু জীবিকার জন্য শহরে চলে যান। জাল গাবের রস লাগিয়ে রাখা হতো।
গ্রামীণ জীবনে মাছ ধরা ছিল উৎসবের মতো। কিন্তু আজ সেই দিন হারিয়ে গেছে। গ্রাম শহর হয়ে উঠছে, খাল-পুকুর ভরাট হয়ে দালানকোঠা উঠছে। বাড়ি গেলে বুক হু হু করে।
এখনকার ছেলেমেয়েরা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তাদের জন্য খাল-পুকুর বাঁচানো যায় না? টাকার জন্য সব ভরাট করতে হবে?
গ্রামের সৌন্দর্য ছিল পুকুর, শান বাঁধানো ঘাট। পুকুরের একপাশে সুপারির খোল ঘেরা জায়গায় মেয়েরা গোসল করত। এখনো গ্রামে গেলে শিকদার চাচার পুকুরে গোসল করি, যদিও সেটাও প্রায় ভরাট।
আশার কথা, সরকার খাল খনন করছে। কিছু খাল বাঁচলে ভালো। হয়তো কোনো শিশু আবার বড়শি হাতে নেবে, কাদামাখা মুখে দৌড়ে বাড়ি ফিরবে, সন্ধ্যার বাতাসে ভাসবে মাছ ধরার গল্প।
*লেখক: মুনালয়, গ্রাম-দক্ষিণ নাজিরপুর, বানারীপাড়া, বরিশাল-৮৫৩০
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]






