প্রায় এক মাস ধরে আমার হাসপাতালে এক রোগিণী ভর্তি। তাঁর ম্যাসিভ স্ট্রোক হয়েছে। এই এক মাসে তাঁর শারীরিক অবস্থায় তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। আমরা সব চেষ্টা করেছি। এখন চাইছি, তিনি কোনো রিহ্যাব ফ্যাসিলিটিতে যান। আমরা যতটা সম্ভব করেছি। এ পর্যায়ে হাসপাতালে আরও থাকলে তাঁর কোনো লাভ হবে না, ক্ষতি ছাড়া। রোগিণীর চার ছেলেমেয়ে বিষয়টা মেনে নিয়েছে। কিন্তু তাঁর বড় মেয়ে মানছেন না। তিনি আইনজীবী এবং শুনেছি পালক (হাসপাতালের সোশ্যাল ওয়ার্কার আমাকে জানিয়েছেন)। তবে রোগিণী তাঁকে বড় ছেলের মতোই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছেন, সমান অধিকার। ছেলে আমাদের কথা শুনছেন, কিন্তু এই পালক মেয়ে শুনবেন না।

সেদিন ছিল বৃষ্টির দিন। সাপ্তাহিক ছুটির পর প্রথম কাজের দিন। রোগিণী এক মাস হাসপাতালে থাকলেও আমার রোগী ছিলেন না এতদিন। আজ প্রথম দেখব তাঁকে। সকাল থেকে নার্সদের টেক্সট আসছে, রোগীর মেয়ে বসে আছেন, কখন দেখবেন। আমি বারবার বলছি, অন্য রোগী দেখে নিই, নির্দিষ্ট সময় বলতে পারছি না। তবু টেক্সট আসতে থাকে। কাজে মন দিলাম। বিকেলে দেখি বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। তখন গেলাম রোগিণীর রুমে।

রোগীর মেয়ে বসে আছেন। আমাকে দেখে বললেন, "সারাদিনে তোমার এখন সময় হলো? আমার মায়ের এটা লাগবে, নার্সরা অমুক জিনিস চেষ্টা করছে না।" তাকিয়ে দেখি, রোগী নিথর হয়ে পড়ে আছেন। পরীক্ষা শেষে তাঁকে বললাম, রোগী রেস্ট নিন। আপনি বাইরে আসুন, কথা বলি।

তিনি বললেন, আমি বারান্দায় বসব। নার্সকে বললাম, বারান্দার দরজা খোলো। খোলা বারান্দা ঢাকা, বৃষ্টির ছাট আসছে না। আমরা বসলাম। রোগীর আপডেট দিলাম। তিনি শুনলেন। তারপর বললেন, "কিছু কথা শোনো।" আমি বললাম, অবশ্যই। আজকের দিনে তাঁর মা আমার শেষ রোগী ছিলেন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

তিনি বললেন, "আমার বয়স তখন ১০ বছর, পথে থাকি।" আমি অবাক হয়ে তাকালাম। তিনি বললেন, "আমি পথশিশু ছিলাম। একদিন দেখলাম, একজন লোক সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট করছেন। ওনার হাতে এক বক্স খাবার। এক বাচ্চাকে ডেয়ার করেছেন, খাবার পথে ফেলে দিতে পারলে উনি ১০ ডলার দেবেন। আমি দেখলাম, বাচ্চা খাবার ফেলে দিল, ১০ ডলার নিয়ে চলে গেল। পেটে তখন তীব্র ক্ষুধা। আমি খাবার তুলে মুখে দেব, এমন সময় একজন মহিলা দ্রুত দৌড়ে এলেন। বললেন, তুমি নিচের খাবার খেয়ো না। অসুখ হবে। আমি বললাম, আপনি খাওয়াবেন তাহলে? তিনি কিছু না বলে হাত ধরে কাছের দোকানে নিয়ে বললেন, যা খুশি অর্ডার করে খাও, দাম আমি দিব। বিশ্বাস করিনি, তবু দেখলাম আসলেই দিলেন। তারপর বললেন, কোথায় থাকো? আমি তখন ফস্টার কেয়ার থেকে পালিয়েছি। অত্যাচার সহ্য করতে পারিনি। বললাম, পথেই থাকি। তিনি ফোন করলেন কাকে যেন। তারপর বললেন, আমার বন্ধুর শেল্টারে কিছুদিন থাকো, তোমাকে আমি অ্যাডপ্ট করব। আমি মাথা নাড়তেই বললেন, যদি পছন্দ না হয়, যেকোনো দিন চলে যেয়ো। বিশ্বাস করো।"

তখনো জানি না, তিনি শহরের সেরা আইনজীবী। আমার মা, তাঁর কথা রেখেছেন। শুধু অ্যাডপ্ট করেননি, পরে চার বাচ্চার মা হওয়ার পরও আমাকে সবার আগে অধিকার দিয়ে রেখেছেন। বিনিময়ে যত ঝামেলা, সব দিয়েছি। নামমাত্র পড়াশোনা। মাতাল হয়ে গাড়ি চালিয়ে জেল খেটেছি। মা ভরসা হারাননি। ঠিকই বের করেছেন।

চার বছর আগে মনে হয়, আইনজীবী হলে কেমন? মাকে বললাম। তিনি হেসে বললেন, "কেন নয়? সেবা করবি মানুষের। দুষ্টুমি অনেক করলি।" পুরো খরচ দিলেন। আমি পরিবর্তিত মানুষ হলাম। ঠিক করেছিলাম, শেষ করে মায়ের ফার্মে জয়েন করে দেখাব, সাহায্য বৃথা যায়নি। তাঁর মতো মানুষ সেবা করব। মাসখানেক আগে পড়া শেষ। আর মা কোমায়। "ডাক্তার, আমি কিছু শুনতে চাই না, তাঁকে ফিরিয়ে আনো।"

কখন বৃষ্টি থামল জানি না। আমি বললাম, "যে মানুষ এত ভালো, তাঁকে বিছানায় ফেলে বছরের পর কষ্ট দেবেন, সন্তান হিসেবে ঠিক হবে?" কালকে ভিডিও অ্যাসিস্টেড লিপ রিডার নিয়ে মাকে দেখব। তিনি বলেছেন, চলে গেলে কষ্ট দিতে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা না করি (রোগীর অ্যাডভান্স ডিরেকটিভ আছে)।

পরদিন ভিডিও অ্যাসিস্টেড লিপ রিডার নিয়ে গেলাম। মেয়েকে বললাম, যা বলার মাকে বলুন। তিনি বললেন, "মা, মা রে, ফিরে আসুন। আমি বদলে গেছি। আপনার কষ্ট বৃথা যায়নি। এই পথশিশু এখন ভালো থাকবে, অন্য পথশিশুকে সাহায্য করবে।" আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। হঠাৎ লিপ রিডার চিৎকার করলেন, "ডাক্তার... ডাক্তার, রোগী বলছেন, আমি জানতাম, তুই পারবি। এখন আমাকে যেতে দে মা।" পরপর অ্যালার্ম বাজল, হার্ট রেট নেই। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, "চান, চেস্ট কম্প্রেশন শুরু করি?" তিনি বললেন, "না। আমার মাকে আর কোনো কষ্ট দিব না।" অন্য চার ভাইবোন বড় বোনকে জড়িয়ে ধরল।

আমি বেরিয়ে বারান্দায় এলাম। চোখ মুছতে হবে। সারাদিনের কাজ বাকি। আমার নিজের মা, যিনি একইরকম কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন, হাজার মাইল দূরে। আব্বু নেই তাঁর সাথে। একটু হাত ধরে বসতে ইচ্ছে করছে।

শান্ত হয়ে যাও পৃথিবী। শত রক্ত–গোলাপ হাতে কোনো এক সকালে আমিও বলতে চাই, আম্মি, ভালোবাসি আপনাকে, অনেক।

পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুন। ভালোবাসায় ডুবে থাকুন। মাথার ছায়া হয়ে থাকুন। ভালোবাসি।