প্রায় চার মাস আগে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। এই হারানো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়—তিনি চিরতরে চলে গেছেন ফেরার দেশে। এখন সবকিছুতেই শুধু মাকে মনে পড়ে। ছোটবেলা থেকে তাঁর দেওয়া শিক্ষাগুলোতে তাঁর অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে, যা আজও আমার মানসিকতা, চিন্তাধারা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধে বেঁচে আছে।

১২ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এসে মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন ফোন বা ভিডিও কলে কথা হতো। তিনি ভয়েসমেইল পাঠিয়ে যোগাযোগ রাখতেন। প্রযুক্তিতে তেমন দক্ষ না হলেও প্রবাসী মেয়েকে ভয়েসমেইল দেওয়ার কায়দা শিখে নিয়েছিলেন।

মায়ের একটা বিশেষ গুণ ছিল—কাছের-দূরের সব প্রিয়জনের জন্মদিন মনে রেখে শুভেচ্ছা জানানো এবং সকলকে আপন করে নেওয়া। বিপদে-আপদে সবার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন। মানবিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক। কর্মজীবনের দীর্ঘ ৩০ বছর সততা ও দক্ষতা নিয়ে সব দায়িত্ব পালন করেছেন।

ডিমেনশিয়া ও আলঝাইমারের কারণে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী হয়ে কষ্ট পাচ্ছিলেন। বাবারও বয়স হয়েছে এবং আমি একমাত্র সন্তান হওয়ায় কয়েক বছর আগে তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসি। ডিমেনশিয়ায় অনেক কিছু ভুলে গেলেও মা আমার জন্মদিনের তারিখ মনে রাখতেন। মা সবসময়ই মা। তাঁর কোনো বিকল্প নেই। মায়ের শূন্যতার কষ্ট আজীবন মনের কোণে থেকে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রে, আমাদের বাড়ির নিকটবর্তী কবরস্থানে আমার মা শায়িত আছেন। তিনি ছিলেন বাংলার শিক্ষক। সম্প্রতি বাংলায় তাঁর কবরস্থানের শিলালিপি তৈরি হয়েছে—বিদেশের মাটিতে আমাদের ভাষার একটুকরা নীরব কিন্তু গভীর উপস্থিতি।

সময় ও পরিস্থিতি বদলালেও কিছু অনুভূতি অপরিবর্তিত থাকে। আমার কাছে সৃষ্টিকর্তার পরেই বাবা-মায়ের স্থান। জীবনে যা কিছু ভালো আসবে, নিশ্চয়ই সানন্দে গ্রহণ করব। না পেলেও কোনো আক্ষেপ নেই। মাকে যত্ন করতে পেরেছি, সম্মানের সঙ্গে তিনি চলে গেছেন—এটাই আমার কাছে শান্তি।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]