কনা আমার শৈশবের সেই বিশ্বস্ত সঙ্গী, সহপাঠী। কবির ভাষায় বললে, বালকবেলার সই। আমাদের মধ্যে চার দশকের দীর্ঘ বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্ব নতুন মাত্রা লাভ করে যখন কনা বিয়ে করে আমাদের আরেক প্রিয় বন্ধু কায়সারকে। মেধাবী কনা পেশায় সফল দন্তচিকিৎসক এবং দেশের অন্যতম সেরা একটি ডেন্টাল কলেজের শিক্ষক। তাদের দুই সন্তান আনিকা ও আফ্ফান। কিন্তু আজকের গল্প কনা-কায়সার দম্পতি বা সন্তানদের নিয়ে নয়, অন্য চারজনের কথা বলব—এরা সত্যিই বিশেষ।
কনার বাড়িতে পা দিলেই মনে হয় অন্য কোনো জগতে চলে এসেছি। এখানে শব্দ কম, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা অসীম। দরজার কাছে নরম পায়ের শব্দ—একটা নয়, দুটো নয়, চারটা। এই চারটি বিড়ালই ঘরের প্রকৃত মালিক, আর কনা তাদের যত্নশীল অভিভাবক।
কনার কাছে এরা কেবল পোষা প্রাণী নয়, পরিবারের সদস্য, সন্তানের মতো। সকাল হলেই শুরু তাঁর ব্যস্ততা। কেউ খাবার চেয়ে মিউমিউ করে, কেউ কোলে উঠতে চায়, কেউ গম্ভীর হয়ে বসে থাকে—যেন সংসারের সব দায়িত্ব তারই।
কনা একে একে সবার খোঁজ নেন—কে কী খাবে, কার মন খারাপ, কে বেশি আদর চায়। এই যত্নে তাঁর বিরক্তি বা ক্লান্তি নেই, শুধু অগাধ ভালোবাসা। ভালোবাসা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, প্রাণীরাও তা অনুভব করে।
আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, পোষা প্রাণী মানুষের জীবনে শুধু আনন্দ নিয়ে আসে না, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্যও অপরিহার্য। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাণীদের সঙ্গে সময় কাটালে স্ট্রেস কমে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, একাকিত্বও মিটে যায়। গবেষণায় আরও বলা হয়, পোষা প্রাণী মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন বাড়ায় এবং মানসিক সুস্থতা উন্নত করে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কনার জীবনেই এসব সত্য বাস্তব। চারটি বিড়াল তাঁর দৈনন্দিন ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। অফিসের চাপ যাই হোক, বাড়িতে ফিরে এরা ঘিরে ধরলে সব দুশ্চিন্তা উড়ে যায়।
অনেকে মনে করেন, পোষা প্রাণী রাখা শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য। কিন্তু এর পরিধি অনেক বড়। সমাজে এরা মানুষকে সহানুভূতিশীল করে। প্রাণীর যত্নশীলরা মানুষের প্রতিও দয়ালু হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ—পোষা প্রাণীর সঙ্গে বড় হলে তারা দায়িত্ববোধ ও সহানুভূতি শেখে।
পরিবেশের ক্ষেত্রেও পোষা প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। গবেষণায় বলা হয়, পোষা প্রাণীরা আমাদের পরিবেশের সতর্কবার্তা প্রদানকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। তারা পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব আগে অনুভব করে এবং আমাদের সতর্ক করে। অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা পোষা প্রাণী পালন করেন, তাঁরা প্রকৃতির সঙ্গে বেশি সংযুক্ত এবং পরিবেশের প্রতি সচেতন হন।
কনার জীবনেও এটি স্পষ্ট। তিনি শুধু বিড়ালদের যত্ন নেন না, তাদের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তাঁর কাছে প্রতিটি প্রাণ মূল্যবান। এই চারটি বিড়াল তাঁকে শিখিয়েছে, ‘আমরা সবাই এই প্রকৃতির অংশ।’
ইতিহাসে অনেক মহান ব্যক্তি প্রাণীভালোবাসার মাধ্যমে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রকৃতি ও প্রাণীপ্রেমী ইতালীয় ক্যাথলিক সাধু সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসি বলতেন, পশুপাখিরাও আমাদের ভাইবোন। তিনি পাখিদের ধর্মোপদেশ দিতেন, নেকড়েকে ভালোবাসায় শান্ত করেছিলেন। উনি বুঝেছিলেন, এই পৃথিবী শুধু মানুষের সম্পত্তি নয়। অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার খেতাবপ্রাপ্ত লেখিকা ডেম জেন গুডঅল সারা জীবন শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, পশুদের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে পৃথিবী রক্ষার লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘কোনো জাতির মহত্ত্ব ও নৈতিক অগ্রগতি বিচার করা যায় সেই জাতির পশুদের প্রতি আচরণ দেখে।’
ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল বিশ্বাস করতেন, ছোট প্রাণীরা মানুষের মানসিক সুস্থতায় গভীর প্রভাব ফেলে। দালাই লামা প্রায়ই বলেন, সব জীবের প্রতি দয়া দেখানোই মানবতার সবচেয়ে বড় গুণ। এসব উদাহরণ শেখায়—প্রাণীভালোবাসা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, নৈতিক দায়িত্বও।
কনার চার বিড়াল—প্রতিটি আলাদা। বাদামি রঙেরটি বাড়ির ‘দুষ্টু রাজা’, নতুন জিনিস দেখলেই তদন্ত করে। টেবিলে বসে থাকে যেন সংসারের ম্যানেজার।
সাদা বিড়ালটি শান্ত, ভদ্র, কিছুটা অভিমানী। আদর না পেলে দূরে চলে যায়, কিন্তু চোখের মায়ায় সবার মন গলে যায়।
ধূসর বিড়ালটি গম্ভীর, পরিবারের ‘দার্শনিক’—দূর থেকে সব দেখে, কম কথা বলে, কিন্তু উপস্থিতি অনুভূত হয়।
কালো বিড়ালটি রহস্যময়। হঠাৎ কোলে এসে বসে, আবার অদৃশ্য হয়। তার স্পর্শে শান্তি ছড়ায়।
এদের আলাদা স্বভাব মিলে কনার ঘর হয়েছে জীবন্ত নাট্যমঞ্চ। প্রতিদিন নতুন গল্প, মূল চরিত্র ভালোবাসা। অভিমান, খুনসুটি, আদর—সব মিলে এক জীবন্ত গল্প। কখনো চারটি টেবিলে রাজত্ব করে, কনা বলেন, ‘এই যে, একটু জায়গা দাও তো।’ তখন ঘরের আসল মালিক কে, তা নিয়ে সন্দেহ হয়!
কনার গল্প শেখায়, ভালোবাসা ছোট যত্নের মধ্যে লুকিয়ে। পোষা প্রাণী আমাদের সহানুভূতিশীল, দায়িত্বশীল, মানবিক করে। একাকিত্বের যুগে এই নিঃস্বার্থ সম্পর্ক অমোঘ ওষুধ। একটা ঘর আয়তনে নয়, ভালোবাসায় বড় হয়। কনার ঘর চার বিড়াল আর বিশাল হৃদয় নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘরগুলোর একটা।
লেখক: সাজ্জাদুল হাসান, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত






