শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলে প্রায়ই আমরা এক অস্বস্তিকর দৃশ্যের সম্মুখীন হই। ছাত্র-ছাত্রীদের অমনোযোগী মনোভাব, হতাশ মানসিকতা বা মোবাইলে মগ্ন ক্লান্ত চেহারা আমাদের গভীরভাবে চিন্তিত করে। এই অস্বাভাবিক ছবি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। মোবাইল ফোন সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে এটি সাধারণ হয়ে গেছে। খুব মনোযোগী, সৃজনশীল, জ্ঞানপিপাসু এবং প্রগতিশীল ছাত্রছাত্রীদের পূর্ণ শ্রেণিকক্ষ এখন কল্পনাতীত। এমন উজ্জ্বল পরিবেশ কমই চোখে পড়ে। ইংল্যান্ডে এক গবেষণায় চিকিৎসকেরা বলেছেন, অতিরিক্ত টাচ স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুরা পেন্সিল ঠিকমতো ধরতে পারছে না। কারণ, তাদের হাতের পেশী সঠিকভাবে গঠিত হচ্ছে না। গবেষণাটি করেছে হার্ট অব ইংল্যান্ড ফাউন্ডেশন এনএইচএস। আমাদের এখনই ভাবতে হবে। পড়াশোনায় মনোযোগ নেই, ক্লাসে উপস্থিতি নেই, আশাব্যঞ্জক ফলাফল নেই। শুধু নেই আর নেই। আমাদের ভবিষ্যৎ অবহেলায় ধ্বংস না হয়, সেজন্য সতর্কতা জরুরি। গত কয়েক দশকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অবকাঠামো এবং ভর্তির হারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে; কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শেখার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
শিক্ষার প্রধান সমস্যা শিখনঘাটতি। প্রাথমিক শেষ করেও অনেক শিশু গণিতে মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে ‘শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা এবং দক্ষতা থেকে কর্মসংস্থান’—এই মানবসম্পদ উন্নয়ন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই শিখনফল অর্জনকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর জন্য শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষায় মনোযোগ বাড়াতে হবে। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা এবার পুরোদমে শ্রেণিকক্ষে ফিরবে বলে প্রত্যাশা করছি।
দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তি কমছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রাথমিক স্তরে এই হ্রাস ৭ শতাংশ। আর ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে ভর্তি কমেছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। সিডিপির গবেষণায় বলা হয়, আর্থিক চাপে শিশুশ্রম বৃদ্ধির কারণে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার বেশি। শিশুশ্রমের কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার বেড়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশে বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে, যা বর্তমানে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২ জানাচ্ছে, মোট শিক্ষা খরচের ৭২ শতাংশ বাংলাদেশের পরিবারগুলোকে বহন করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি সর্বোচ্চ। গণসাক্ষরতা অভিযানের ‘এডুকেশন ওয়াচ ২০২৩’ গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, প্রাথমিক শিক্ষায় (পঞ্চম শ্রেণি) এক শিক্ষার্থীর পরিবারের শিক্ষার গড় বার্ষিক ব্যয় ২০২২ সালে ১৩ হাজার ৮৮২ টাকা ছিল, যা ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে ২৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮ হাজার ৬৪৭ টাকা হয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষায় (নবম শ্রেণি) গড় বার্ষিক খরচ ২০২২ সালে ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা ছিল, যা ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে ৫১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২০ হাজার ৭১২ টাকা হয়েছে। এই খরচবৃদ্ধির পেছনে প্রাইভেট টিউশন, কোচিং এবং নোট বা গাইড বই প্রধান দায়ী বলে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। এভাবে শিক্ষা ব্যয় বাড়ার ফলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চাকরি, ব্যবসা সহ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ভাবায়। সংশ্লিষ্ট সবার শুভ উদ্যোগের প্রত্যাশা করি।
স্বাধীনতার পর এই সময়ে আমরা কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করতে পারিনি। সাধারণ শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যমের বাইরের কারিকুলাম, মাদ্রাসাভিত্তিক, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের চিন্তাধারাকে একত্রিত করতে পারছে না, দেশে দক্ষ মানবসম্পদ গড়তেও অক্ষম। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো উন্নয়ন না করলে এআই-এর যুগে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সামলানো আমাদের মতো দেশের জন্য বড় হুমকি। আমরা এমন এক স্থায়ী শিক্ষানীতি বা কমিশন চাই, যেখানে দুর্নীতি, ধর্মীয় ও সামাজিক অসহিষ্ণুতা কমানোর জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলা হবে, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে।
এখনকার শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন তখন ছিলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে একটি জাতিকে নকলের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা চেয়েছিলেন, তাঁকেই বর্তমান সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানুষের মনের কথা শুনে আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। যাঁর নামের সঙ্গে বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ক্রনিক সমস্যা ‘নকল’ নির্মূলের ঘটনা জড়িত। পুরো দেশ নকলের মহামারিতে আক্রান্ত ছিল। এই অবৈধ কাজ আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল, সবাই এটিকে স্বাভাবিক মনে করত। কিন্তু এটি এক জাতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে, সে সচেতনতা ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম, কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে এই সমস্যা নেই। কিন্তু দেশজুড়ে এটি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়েছিল। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর হাত ধরে শিক্ষাব্যবস্থা আলোর পথ পেয়েছে। খবরের কাগজে দেখা গেছে, কারিগরি শিক্ষায় বড় ধরনের জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্পোর্টস, আর্টস, সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আরেক সুখবর, বাজেটের বড় অংশ শিক্ষা খাতে দেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এখন শিক্ষা খাতের বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের কাছাকাছি। এটিকে ৫ শতাংশে নেওয়া হবে। এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিজ্ঞা। সাধুবাদ।
এবার জাতি শিক্ষার উন্নয়নে নতুন কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায়।
শিক্ষা খাতের দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ১২ দফা প্রাথমিক কার্যসূচি ঘোষণা করেছেন। সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহারের কয়েকটি অঙ্গীকার এতে অন্তর্ভুক্ত। কার্যসূচিতে শিক্ষার বাজেট বাড়ানো, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার জোরদার করা (ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব), বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, শিক্ষাক্রম ও পরীক্ষা পদ্ধতি পর্যালোচনা, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার গুরুত্ব এবং সব ধরনের বিদ্যালয়ে ন্যূনতম শিখনমান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন বক্তব্যে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দুর্নীতি দূর করা, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা এবং কারিগরি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, মানবসম্পদ আলোকিত হোক। সেই প্রত্যাশা।
*লেখক: মো. বদরুল আলম, শিক্ষক






