আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, আর সেই অগ্রযাত্রায় আমাদের রাজধানী ঢাকাও পিছিয়ে নেই। যানজট, আবর্জনা ও জনঘনত্বের শীর্ষে থাকা এই শহরকে বাসযোগ্য ‘স্মার্ট সিটি’য়ে রূপান্তরিত করা এখন সময়ের তাগিদ। ঢাকা শহরে জনসংখ্যার চাপ, যানজট, বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে শহরবাসীরা প্রতিদিন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে ঢাকা নানা সমস্যায় জর্জরিত। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং ডেটা অ্যানালিটিকসের সাহায্যে এই শহরকে উন্নত স্মার্ট সিটিতে পরিণত করা সম্ভব।

ঢাকাকে স্মার্ট সিটি বানানো কেবল বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। গুলশানের মতো এলাকাগুলোতে এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ করা গেলে ধীরে ধীরে উত্তরা, ধানমন্ডি এবং ক্রমান্বয়ে পুরো ঢাকাকে আমরা একটি বাসযোগ্য আধুনিক মহানগরী হিসেবে দেখতে পারব।

রাজউক-এর আওতাধীন ‘গুলশান মডেল টাউন’ এখন গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা। ‘স্মার্ট সিটি’ প্রকল্পের পাইলট জোন হিসেবে এই এলাকা ব্যবহার করে ধাপে ধাপে পুরো শহরে আধুনিক প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা যায়। এই পাইলট জোনকে প্রযুক্তিনির্ভর মডেল হিসেবে গড়ে তুললে তা সমগ্র ঢাকার জন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে।

ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। গুলশানের মতো এলাকায় শত শত অফিস ও কূটনৈতিক মিশন রয়েছে, সেখানে গতানুগতিক ট্রাফিক পুলিশিং দিয়ে জট নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। এআই-সম্পন্ন ক্যামেরা ও সেন্সর দিয়ে রিয়েল-টাইমে গাড়ির সংখ্যা ও গতি বিশ্লেষণ করে স্মার্ট ট্রাফিক লাইট চালানো যায়। যে লেনে গাড়ি বেশি, সেখানে অটোমেটিক গ্রিন সিগন্যাল দীর্ঘস্থায়ী হবে। যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সিগন্যালের সময় পরিবর্তন হবে, ফলে অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষা কমবে। জরুরি যানবাহন (অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস) শনাক্ত করে তাদের জন্য আলাদা করিডর তৈরি করাও সম্ভব। এতে গুলশানের ব্যস্ত মোড়ে যানজট অনেকাংশে কমবে। হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রণের চেয়ে এটি অনেক কার্যকর।

শহরের সৌন্দর্য ও পরিবেশের জন্য জলাশয়গুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গুলশানের লেক দুটি এই এলাকার ফুসফুস। প্রযুক্তির সাহায্যে এই লেকগুলোকে সুন্দর রাখা সম্ভব।

গুগল ম্যাপসের ডেটা ব্যবহার করে রাস্তায় দুর্ঘটনা বা জট হলে এআই সিস্টেম অ্যাডাপ্টিভ সিগন্যালিংয়ের মাধ্যমে গাড়িগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকল্প রাস্তায় ডাইভার্ট করার সংকেত দিতে পারে।

রাস্তায় অবৈধ পার্কিং যানজটের বড় কারণ। স্মার্ট পার্কিং অ্যাপ দিয়ে চালকেরা গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ফাঁকা জায়গা দেখতে পারবেন। সেন্সরযুক্ত পার্কিং মিটার থেকে তথ্য অ্যাপে আসবে। নির্দিষ্ট জায়গায় পার্কিং করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ)-এ চার্জ কাটা হবে। এতে বিশৃঙ্খল পার্কিং কমবে।

গুলশানে প্রতিদিন বিপুল বর্জ্য উৎপন্ন হয়। স্মার্ট সিটিতে ময়লা রাস্তায় পড়বে না। আইওটি-ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রাস্তার স্মার্ট ডাস্টবিনে সেন্সর থাকবে। ৮০ শতাংশ পূর্ণ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিটি কর্পোরেশনের সার্ভারে সিগন্যাল যাবে।

বর্জ্য আলাদা করার জন্য (প্লাস্টিক, জৈব, ধাতব) আইওটি সিস্টেম চালু করা যায়। সংগৃহীত বর্জ্য আধুনিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে পাঠিয়ে জৈব বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও সার উৎপাদন করে স্থানীয়ভাবে ব্যবহার সম্ভব। এভাবে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়া যাবে।

শহরের সৌন্দর্য ও পরিবেশের জন্য জলাশয়গুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গুলশানের লেক দুটি এই এলাকার ফুসফুস। প্রযুক্তির সাহায্যে এই লেকগুলোকে সুন্দর রাখা সম্ভব। লেকের পানিতে ওয়াটার কোয়ালিটি সেন্সর বসিয়ে পানির পিএইচ (pH) লেভেল ও অক্সিজেনের মাত্রা রিয়েল-টাইমে মনিটর করা যায়। দূষণ বাড়লে কর্তৃপক্ষ সতর্কবার্তা পাবে। পানির ভাসমান আবর্জনা পরিষ্কারে স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক ক্লিনার বোট ব্যবহার সম্ভব।

গুলশানের লেকগুলো দূষণের কারণ আশপাশের বাড়ির বর্জ্য ফেলা। এটা বন্ধ না করলে লেক পরিষ্কার রাখা অসম্ভব। ক্লাস্টার-ভিত্তিক আধুনিক পয়োশোধনাগার (Sewage Treatment Plant) বসিয়ে সমস্যা সমাধান সহজ। স্মার্ট সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টগুলো আইওটি সেন্সর, এআই ও ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য, পানি শোধন স্বয়ংক্রিয় করে, কায়িক শ্রম কমায়। এটি পানির প্রবাহ, pH ও অক্সিজেন রিয়েল-টাইমে মনিটর করে।

গুলশানসহ ঢাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রধান কারণ মশা। স্মার্ট সেন্সর দিয়ে মশার ঘনত্ব শনাক্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন স্প্রে করা যায়। মোবাইল অ্যাপে নাগরিকরা মশার প্রজননস্থল রিপোর্ট করতে পারবেন।

গতানুগতিক বিষাক্ত ওষুধের বদলে জৈবিক লার্ভিসাইড ব্যবহার করে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব। এই লার্ভিসাইড Bacillus thuringiensis israelensis নামক প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে মশার লার্ভা ধ্বংস করে। পানিতে প্রয়োগের পর লার্ভাগুলো প্রোটিন ক্রিস্টাল খেয়ে ২ থেকে ২৪ ঘণ্টায় মারা যায়। এটি শুধুমাত্র মশার জন্য সুনির্দিষ্ট, মানুষ বা অন্য প্রাণীর ক্ষতি করে না। এভাবে প্রযুক্তিনির্ভর মশা নিয়ন্ত্রণ টেকসই হবে।

স্মার্ট সিটির প্রধান শর্ত নাগরিকের নিরাপত্তা। এলওসিসি-এর আওতায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ সিসিটিভি ক্যামেরা রাস্তায় ও মোড়ে আছে। এগুলোতে ফেশিয়াল রিকগনিশন যুক্ত করে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়। এআই যোগ করে অপরাধের আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

স্মার্ট স্ট্রিট লাইটে মানুষ চলাচলের সময়ই বাতি জ্বলবে, অন্য সময় বন্ধ বা হালকা জ্বলবে—এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। প্রতি ল্যাম্পপোস্টে ‘ইমার্জেন্সি বাটন’ থাকবে, চাপলে নিকটের থানা বা কমান্ড সেন্টারে সংকেত যাবে এবং অপারেটরের সঙ্গে কথা বলা যাবে।

স্মার্ট সিটিতে প্রযুক্তির পাশাপাশি নাগরিকের অংশগ্রহণ জরুরি। ডিজিটাল ফিডব্যাক প্ল্যাটফর্মে নাগরিকরা সমস্যা রিপোর্ট করতে পারবেন। অ্যাপে ট্রাফিক, বর্জ্য, নিরাপত্তা বা পরিবেশ তথ্য শেয়ার করা যাবে। এতে শহর আরও কার্যকর ও টেকসই হবে।

স্মার্ট সিটি তৈরিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক লাইট, অ্যাপ-ভিত্তিক পার্কিং, স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, লেক রক্ষণাবেক্ষণ, মশা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা চালু করলে গুলশান আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ এলাকার মডেল হবে।

ঢাকাকে স্মার্ট সিটি বানানো কেবল বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। গুলশানের মতো এলাকাগুলোতে এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ করা গেলে ধীরে ধীরে উত্তরা, ধানমন্ডি এবং ক্রমান্বয়ে পুরো ঢাকাকে আমরা একটি বাসযোগ্য আধুনিক মহানগরী হিসেবে দেখতে পারব। সরকার, সিটি কর্পোরেশন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে।

*লেখক: সৈয়দ আলমাস কবীর, সহসভাপতি, গুলশান সোসাইটি, সাবেক সভাপতি, বেসিস