বাংলাদেশে এখন তীব্র গরম। কিন্তু আমি গত আগস্ট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে জর্জিয়া রাজ্যে বসবাস করছি। এখানে শীত শেষ হয়ে বসন্ত শুরু হয়েছে। নাম বসন্ত হলেও এখানকার বাতাসে সেই মাতাল সমীরণের ছোঁয়া পাওয়া যায় না। বরং কখনো কখনো তাপমাত্রা বেড়ে অস্বস্তি সৃষ্টি করে। আগে মধ্য-পশ্চিমের ইলিনয় রাজ্যে স্নাতকোত্তর করেছি। সেখানে গরম আসতে কিছুটা বেশি সময় লাগে।
এ দেশের বৈচিত্র্যময় আবহাওয়ায় এপ্রিলেও সূর্যের তাপ কমে গেলে পাতলা সোয়েটার পরতে হয়। পশ্চিমা শীতের অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম শীতটা চমকপ্রদ ছিল। মফস্বল শৈশব-কৈশোরে বাংলাদেশের মাঘের শীত কিছুটা গায়ে লেগেছে। ফরিদপুরের ছোট টিনের বাড়ির চন্দ্রাতপ, উত্তরের হাওয়া, বাবার খদ্দরের চাদর, মায়ের ভোরের ঝকমারি—শীতের স্পর্শ ছিল সেই সময় থেকেই। ইলিনয়ের এক কলেজ টাউনে হেমন্তের নাতিশীতোষ্ণ রাতে পৌঁছে লোকমুখে শুনতাম, ‘বাছা, এলে তো বটে, শীত কাটলে হয়!’ শীতল ভাব মেরুদণ্ডে নামত, তবু প্রথম প্রবাসী শীতের উত্তেজনা ছিল।
শরৎ শেষ হলে গাছের পাতা সবুজ থেকে রঙিন, তারপর ন্যাড়া হয়ে শীতের আগমন ঘোষণা করল। লাগেজ থেকে হাতমোজা, পাফার জ্যাকেট, কানটুপি বেরোতে লাগল। এ দেশের লোকেরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস কঠোরভাবে মানে, কারণ তা প্রায় সবসময় মিলে যায়। একদিন এল সেই পূর্বাভাস—বরফ পড়বে! ভারী দস্তানা, উপযুক্ত জুতা পরে ল্যাবে যাওয়ার সময় দেখলাম ড্রাইভওয়েতে লবণ ছড়ানো হচ্ছে। সময়মতো বরফ পড়ল—পেঁজা তুলোর মতো, গায়ে পড়ে জল হয়ে যাচ্ছে। পরে এটি নিয়মিত হলো, কখনো তুষারঝড়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। বাইরে ঝড়, ভেতরে আড্ডা আর দেশী খাবারের মৌতাত। কখনো ঢালু জমিতে স্লাইডিং প্রতিযোগিতা—প্লাস্টিক ঢাকনা থেকে ট্রাফিক সাইনবোর্ড নিয়ে সবাই ছেলেমানুষি খেলা।
মাস্টার্স শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য আমার বরফের গল্পও শেষ। পিএইচডি করতে যে শহরে এসেছি, সেই আটলান্টাতে বরফ পড়ে কালেভদ্রে। বরফের জায়গা নিয়ে নিয়েছে বৃষ্টি আর জোলো বাতাস। শীত এখানে অনেক কম। একটানা বরফ বা বৃষ্টি মনে বিষণ্ণতা জাগায়, বিশেষ করে কাজ না থামলে। সকালে উঠলেও বাইরে বরফ, কফির ইচ্ছে হলেও ক্লাস-ল্যাব চলতে থাকে। হতাশায় ভরা দিন শেষে ঘরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া, পরের দিনের প্রস্তুতি। সেমিস্টার ব্রেকে কনফারেন্স, প্রফেসরের সঙ্গে মিটিং, লেখার কাটাছেঁড়া। থিওরেটিক্যাল কোর্সের অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট, পরীক্ষা—ডিপ্রেশন অক্টোপাসের মতো চেপে ধরে। ফাইনাল শেষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েটরা শীতনিদ্রায়, ক্যাম্পাসে গ্র্যাজুয়েটরা গবেষণায় মগ্ন। জনশূন্য ক্যাম্পাসে একা হাঁটতে শৈশবের স্মৃতি, দেশের আপনজন মনে ভাসে। চোখের জল মুছে ভুলতে হয় বিদেশের ঠান্ডায় হৃদয়ের দুঃখ। মাস্টার্সের সময় শীতের রাতে ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে বাসায় ফেরা—শূন্যের নিচে তাপমাত্রায় সাদা বরফের মরুভূমিতে দিগভ্রান্ত পথিকের মতো। শৈশবের ছুটি ফুরিয়ে যেত চোখের পলকে, এখন লম্বা ছুটিতে ফাঁকা ক্যাম্পাস বিষাদ জাগায়। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে ভালো লাগত!
*লেখক: পার্থ প্রতিম ভৌমিক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং, জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, আমেরিকা
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]






