‘হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস’—সৈয়দ শামসুল হকের লেখা এবং এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া এই গান যেন আমাদের জীবনের কঠোর বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। কথায় আছে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। অর্থাৎ যতক্ষণ দম আছে, ততক্ষণ জীবন ও আশার সম্ভাবনা। ‘দম’ ছবি দেখার সময় এই কথাগুলো বারবার মনে ভাসছিল। ‘দম’–এর কাহিনি ইতিমধ্যেই আমাদের জানা হয়ে গেছে। জানা হয়ে গেছে এর শেষ পরিণতিও। কিন্তু সেটাকেই পর্দায় তুলে আনা এবং দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা ছিল একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। ছবি দেখা শেষ করে মনে হলো, পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।

প্রথমে বলা যাক ছবির সিনেমাটোগ্রাফি বা চিত্রগ্রহণ নিয়ে। সর্বশেষ ‘হাওয়া’ ছবির চিত্রগ্রহণে মুগ্ধ হয়েছিলাম। পার্থক্য শুধু একটি—‘হাওয়া’ ছিল পানির ছবি, আর ‘দম’ তার উল্টো, ঊষর মরুভূমির। আমি কোনো চলচ্চিত্রবিশারদ নই, তবু ‘দম’–এর দৃশ্যগুলো ছিল অসাধারণ নয়নজুড়ানো। পর্দার সামনের সিটে বসে ছবি দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই দৃশ্যকল্পে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। বিশেষ করে গতিময় দৃশ্যগুলোতে মনে হচ্ছিল, ঘটনাগুলো যেন চোখের সামনেই ঘটছে।

এত দিন যেখানে বাংলা ছবি নিয়ে নাক সিটকিয়ে এসেছেন, সেখানে কিছুটা হলেও ভালো লাগা তৈরি হতে বাধ্য।

এবার অভিনয়ের কথা। আফরান নিশো আগেই তাঁর অভিনয়ক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। ‘দম’–এ তাঁর এই চরিত্র আগের সবকটাকে ছাপিয়ে গেছে। একাই পুরো কাহিনির জোয়াল বয়ে নিয়ে এগিয়ে গেছেন। হাসি, কান্না, রাগ, বিমর্ষতা—সবকিছু নিজস্ব অভিব্যক্তিতে দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শুরুতেই দেখানো হয়েছে তাঁর পায়ে চোট। তারপর পুরো ছবিতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছেন, কোনো দৃশ্যেই ব্যতিক্রম হয়নি। নিজে খুঁড়িয়ে হাঁটলেও কাহিনিকে সোজা এগিয়ে দিয়েছেন। প্রত্যয় ব্যক্ত করলে দর্শকরা তাঁর সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন, কাকুতি-মিনতিতে সবাই তাঁর সঙ্গে অনুনয় করেছেন। পুরো সময় দর্শকরা পিনপতন নীরবতায় ছবি দেখেছেন। শেষে প্রতিক্রিয়ায় একই মত প্রকাশ করেছেন।

অন্য চরিত্রের অভিনেতারাও নিশোকে পুরোপুরি সহযোগিতা দিয়েছেন। আফগানিস্তানের দৃশ্যগুলো খুব ভালো লেগেছে। বাস্তবে আফগানিস্তানের ভূপ্রকৃতি জানি না, তবে দৃশ্যায়ন ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশের গ্রামের পরিবেশ যতটুকু দেখানো হয়েছে, তা পুরোপুরি বাস্তব। মাটির মেঝে, শণের বেড়ায় মাটির প্রলেপ, ওপরে টিনের চাল—এমন ঘর গ্রামে একসময় সর্বত্র ছিল। আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে এগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির রাতে টিনের চালে পানি পড়া, মশারির ওপর পলিথিন বিছিয়ে ঠেকানো—এগুলো ছিল গ্রামীণ জীবনের অংশ। গ্রামের টিউবওয়েলে পানি নিয়ে গোসলও জীবনের অংশ ছিল। বনলতা এক্সপ্রেস যেন জীবনের মায়ার গল্প।

এই ছবি নিয়ে বেশি লিখলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা আছে, কারণ ‘দম’ অনুভব করার ছবি। আমার এক বন্ধু বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে সবসময় উষ্ণ। তিনি ‘দম’ দেখে বলেছেন, “আমার মনে হয় নাই যে বাংলাদেশের কোনো ছবি দেখলাম। বাংলাদেশের তথাকথিত কাহিনি এবং হাস্যরসের বাইরে গিয়ে এমন ছবিও যে বানানো সম্ভব “দম” না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আর আফরান নিশো আমাকে ছবির পর্দায় আটকে রেখেছিল।” আমিও তার সঙ্গে একমত। এতদিনে মনে হলো, বাংলা সিনেমারও দম আছে বিশ্ববাজারে নিজেকে তুলে ধরার। দম আছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। দম আছে প্রতিযোগিতায় টেক্কা দেওয়ার।

পুরো ‘দম’ টিমকে শুভকামনা। ‘বঙ্গজ ফিল্মস’ এবং স্বত্বাধিকারী তানিম ভাইকে ধন্যবাদ, অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের নিজেদের ছবি দেখার সুযোগ দিয়ে। যাঁরা এখনো ‘দম’ দেখেননি, তাঁদের অনুরোধ, কাছাকাছি হলে গিয়ে দেখুন। এত দিন যেখানে বাংলা ছবি নিয়ে নাক সিটকিয়ে এসেছেন, সেখানে কিছুটা হলেও ভালো লাগা তৈরি হতে বাধ্য।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]