জীবিকার চাপে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটোছুটি করতে হয়েছে আমাকে। ছোটবেলা থেকেই মনে একটাই স্বপ্ন বাসতাম—সারা বিশ্ব ঘুরে দেখব। তবে তখন সেই স্বপ্ন মনে হতো প্রায় অসম্ভব কল্পনা।

বাবা বন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। সততার সঙ্গে জীবনযাপনের কারণে তাঁর বেতন দিয়ে সংসার চালানো ছিল খুবই কষ্টকর। কিছু জমিজমা থাকলেও বিলাসিতা আমাদের জীবনে কখনো স্থান পায়নি। এমন সাধারণ পরিবারে, একেবারে অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নিয়ে আমি মনে মনে দুনিয়া দেখার স্বপ্ন লালন করতাম—যা কেউ জানত না, শুধু আমি আর আমার মন।

অটল ইচ্ছাশক্তি ও প্রবল আকাঙ্ক্ষাই সম্ভবত আমাকে আজ এই স্থানে এনেছে। এখনো সুযোগ পেলেই ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। দেশ ঘোরা আমার কাছে নেশার মতো, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ যে নগরীর কথা বলব, সেটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল ও আলোকসজ্জিত শহর—হংকং। ৯৯ বছর ব্রিটিশ শাসনের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা এই ছোট্ট নগরী যেন স্বপ্নের সাজমহল। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

এখানেই জীবনের প্রথম পাতালরেল ভ্রমণ করি। Tsim Sha Tsui থেকে Wanchai—এই রুটের কিছু অংশে ট্রেন চলে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে। সমুদ্রের নিচে ছুটন্ত ট্রেনে বসে থাকার অনুভূতি ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন—শ্বাস আটকে আসে, আবার মুগ্ধতায় মন ভরে যায়।

এই স্বপ্নের নগরীতেই পাই প্রথম চাকরি। চারদিকে সমুদ্রঘেরা ছোট দ্বীপ—হংকং। থাই এয়ারওয়েজে প্রথমবার হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার সময় মনে হয়েছিল, বিমানটা যেন পানির ওপরেই নামছে!

তবে এই আলোর শহরের সবকিছু আলোকোজ্জ্বল নয়। কিছু অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে।

বাসা থেকে কর্মস্থলে যাতায়াতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগত। বেশিরভাগ সময় বাসেই যেতাম। প্রায়ই লক্ষ্য করতাম—আমি বা অন্য কোনো বিদেশি বাসে উঠলে হংকংয়ের স্থানীয় অনেক নারী আমাদের পাশে বসতেন না। পেছনের বা পাশের সিটও এড়িয়ে যেতেন। এক সিট ফাঁকা রেখে বসতেন। বারবার এই দৃশ্য দেখে মনে হতো—আমাদের মতো গরিব, কালো চামড়ার মানুষদের তারা অবহেলা বা ঘৃণার চোখে দেখে।

আরেকদিন রবিবারের ছুটিতে আমি ও বিক্রমপুরের এক বন্ধু কাওলুনের একটি বড় পার্কে বেড়াতে যাই। ছবি তোলা, ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া—সব মিলিয়ে দিনটা ছিল সুন্দর। ফেরার পথে এক নারী তাঁর ছোট বাচ্চাকে নিয়ে পার্কে ঘুরছিলেন। বন্ধুটি বাচ্চার সঙ্গে একটা ছবি তোলে। পরে আদর করে কোলে নিয়ে ছবি তুলতে চাইতেই ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা।

নারী হঠাৎ হাউমাউ করে কান্না শুরু করেন। এমনভাবে চিৎকার করছিলেন, যেন আমার বন্ধু তাঁর বাচ্চাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে! মুহূর্তে অনেক মানুষ জড়ো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে আমাদের থানায় নিয়ে যায়। সব শোনার পর পুলিশ বন্ধুকে ক্ষমা চাইতে বলে এবং ভবিষ্যতে এমন না করার সতর্কতা দিয়ে ছাড়িয়ে দেয়।

জীবনপথে বহু দেশে চাকরি করেছি। অসংখ্য অভিজ্ঞতা আজ আমার সঙ্গী—ভালোর পাশাপাশি তিক্ত বাস্তবতাও। হংকং আমাকে শিখিয়েছে, আলোঝলমল শহরের আড়ালেও মানুষের মন সবসময় আলোকিত হয় না।

তবু জীবন এগিয়ে চলে। অভিজ্ঞতাই মানুষকে পরিণত করে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]