মসজিদ সেলাত দেখে আমরা পুলাউ বেসার দ্বীপে যাওয়ার জন্য সমুদ্রপাড়ের বোটঘাটায় পৌঁছালাম। স্পিডবোটে করে যাব এই দ্বীপে। 'পুলাউ' মানে দ্বীপ, 'বেসার' মানে বড়—অর্থাৎ বড় দ্বীপ। সত্যিই এটি বড় দ্বীপ, কারণ আশপাশে ছোট ছোট আরও কয়েকটি দ্বীপ দেখা যায়। ফেরিতে গিয়ে যাওয়া যায়, তবে আমরা স্পিডবোট বেছে নিয়েছি। আগেও একবার স্পিডবোটে এখানে এসেছি, ফেরিঘাটে যাইনি। ফেরিতে ১০ রিঙ্গিতে যাওয়া যায়, সেটা জানি। স্পিডবোট রিজার্ভ করলে যাওয়া-আসা ১৫০ রিঙ্গিত, সর্বোচ্চ ১২ জন যাত্রী নেওয়া যায়। আমাদের দলে ১৪ জন থাকায় দুটি স্পিডবোটে যেতে হয়। এতে ট্যুর ক্যাশিয়ার ও ক্লাবের সেক্রেটারি হিরণ ভাইয়ের মন খারাপ হয়, কিন্তু স্পিডবোটের গতি বাড়তেই তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। বোটের পাটাতনে দাঁড়িয়ে-বসে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ছবির পর সবাই মিলে নেচে-গেয়ে রিলস ভিডিও করেন। এমন উপভোগ্য যাত্রায় আমরা পুলাউ বেসারে পৌঁছে যাই। বোট থেকে লাফিয়ে নামি সমুদ্রের ঢেউ-ভেজা বালুতে। সৈকত পেরিয়ে কূলে এসে দেখি, অন্য বোট থেকে মই দিয়ে সাবধানে নামছেন আরবিনা ভাবি, পাশে রাজু ভাই। ভাবি আমার পাশে এসে দেখান, রাজু ভাই অন্য একজনকে হাত ধরে নামাতে সাহায্য করছেন। এ সময় বউয়ের মন্তব্য কী হতে পারে, সবাই জানেন।

দ্বীপে উঠে প্রথম গ্রুপ ছবি তুলে রাখি। তারপর পাকা পথে হাঁটতে হাঁটতে যাই হজরত আবদুল কাদের জিলানি (র.)-এর বংশধর হজরত সুলতান আল আরিফিন শেখ ইছমাইলের কবর দেখতে। কবরের নামফলক অনুসারে, সুলতান আল আরিফিন ১৪৯৫ সালে বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচার করে মালাক্কায় আসেন এবং পুলাউ বেসারেই ইন্তেকাল করেন। এখানে তাঁর পরিবারের আরও কয়েকটি কবর আছে, সবগুলোই লম্বা—একেকটা ১০–১৫ ফুট দীর্ঘ। এই কবরগুলোই দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ।

সৈকতের কাছে দ্বীপের তথ্যকেন্দ্র। গাছের ছায়ায় চেয়ারে বসে ছিলাম, কিন্তু রোববার ও ঈদের পরদিন হওয়ায় তথ্যকেন্দ্র বন্ধ। বিস্তারিত তথ্য জানা হয়নি। বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললে হয়তো জানা যেত, কিন্তু দলের আয়োজনে ব্যস্ততায় সময় হয়নি। পরে গেলে জানব। পরবর্তীতে গুগল করে মালয়েশিয়ান সংবাদপত্র ব্রিতা হারিয়ানের ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত লেখা থেকে জানি, এই কবরকে কেন্দ্র করে কিছু শরিয়া পরিপন্থী কাজ হয়।

গানের আসর শেষে কুয়ালালামপুরে ফেরার আগে আমাদের যাওয়ার কথা ছিল তামান সিরিবু বুঙ্গায়। তামান সিরিবু বুঙ্গা নামটাকে বাংলা করলে হয় হাজার ফুলের বাগান। ওখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমাদের গাড়ি চলতে থাকে।

সৈকতের পাড়ে কাঠের চেয়ার-টেবিল পাতা, ভাড়া লাগে না। গাছের ছায়ায় বসে দূর সমুদ্র দেখি, মালাক্কা প্রণালির কোন দিকে সিঙ্গাপুর কোন দিকে ইন্দোনেশিয়া তা বোঝার চেষ্টা করি। এসব না ভেবে জলের দিকে তাকিয়ে উপভোগ করা যায়। ঘণ্টা দেড়েক এখানে কাটাই। এখন স্মরণ করলে আবার যাওয়ার ইচ্ছে হয়। আমি ও আরও দুজন ছাড়া সবাই সমুদ্রে গোসল করেন। তলদেশ থেকে বড় সামুদ্রিক পাথর তুলে আনেন, পরে সঙ্গত কারণে সমুদ্রে ফেলে আসেন। পানি ছাড়া অন্য খাবার ভালো নয়, তাই খেয়ে আসা বা সঙ্গে নিয়ে আসা উচিত। অনেকে ক্যাম্প করে রাত কাটান, খাবার বা রান্নার সামগ্রী নিয়ে আসেন।

বিকেল পাঁচটায় স্পিডবোটে ফিরি। সমুদ্রপাড়ে ঘণ্টা খানেক গান-গল্পে কাটে। প্রধান ভোকাল মোস্তাক রয়েল শান্ত ভাই। ভালো গান করেছেন আমিন ভাই, সাঈদ ভাই, হিরণ ভাই, রাজু ভাই ও বাপ্পী। ছবি-ভিডিও তোলেন শওকত হোসেন জনি। কায়সার হামিদ হান্নানের ভূমিকা রহস্যময়—তাকে বলি বাঙালি চিরকুমার সংঘ মালয়েশিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক। বাংলাদেশ থেকে আসা নায়ক-নায়িকায় ব্যস্ত। ফেরার বোটে গান গেয়ে আনন্দ করলে মালয়ু বোটচালকও হাসেন। স্থানীয়রা খুশি হলে আমরাও বিজয়ী হয়ে যাই।

গানের আসর শেষে কুয়ালালামপুরে ফেরার আগে আমাদের যাওয়ার কথা ছিল তামান সিরিবু বুঙ্গায়। তামান সিরিবু বুঙ্গা নামটাকে বাংলা করলে হয় হাজার ফুলের বাগান। ওখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমাদের গাড়ি চলতে থাকে। অর্ধেক পথে হোয়াটসঅ্যাপে খবর আসে, মালাক্কা সিটি করপোরেশন ও ট্যুরিজম বিভাগের উদ্যোগে পথে ফুলগাছ লাগানো হয়েছে। তাই তামান সিরিবু বুঙ্গা এবার না গিয়ে অন্য সময় রাখি। নেতৃবৃন্দের পরামর্শে গাড়ি মালাক্কা সেন্ট্রালে যায়। অন্যরা আগে পৌঁছে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় খেতে শুরু করেছেন—তাজা গরুর মাংস, নলা, নীলা মার্কেটের হাসের মাংস ও সাদা ভাত। আমরা পরে পৌঁছে অবশিষ্ট খাই, আলহামদুলিল্লাহ ভালো ছিল। এটাই মালাক্কায় শেষ খাওয়া, তারপর কুয়ালালামপুরে ফেরা। ক্যাশিয়ার সাহেব তালা লাগান।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

মহাসড়কে ফেরার পথে জ্যামে আটকে যাই। ওয়াইজ গ্রামীণ-পাহাড়ি পথে নিয়ে যায়—ছোট রাস্তা, ঘন মোড়, নীরব গ্রাম। মাঝে ঈদের ওপেন হাউস ও আতশবাজি দেখা যায়। অচেনা পথ পাড়ি দিয়ে মহাসড়কে ফিরি। সেরেমবানে বিশ্রামাগারে গাড়ি থামাই। নাম বারহেনতিয়ান সিনাওয়ান। আমিন ভাইয়েরা চা-কফি খাওয়ান, সুইট কর্ন খাই। গভীর রাত, ঈদের দ্বিতীয় দিন। মালয়রা পরিবার নিয়ে ঘুরছেন। বিশ্রামাগার সড়কের অংশ, দাম সস্তা। মালয়েশিয়ার রুটি-পরোটার সঙ্গে ডাল-ভাজি-মাংস ফ্রি।

বারহেনতিয়ানে সুইট কর্ন খাওয়া স্মরণীয়—মধ্যরাতে নিয়ন আলো, মুখরতা কিন্তু শান্ত। মালয়রা ছোট করে কথা বলেন, শব্দদূষণ করেন না। পারিবারিক পরিবেশ। তারপর রওনা দিয়ে জ্যাম এড়াই। গানে ক্লান্তি ভুলে সাঈদ ভাই ও কাদের ভাই গান গান। গাড়ি বাসার গেটে থামে, দুই দিনের ভ্রমণ শেষ। লিখতে লিখতে আবার ভ্রমণের ইচ্ছে হয়—অচেনা দ্বীপে, তারুণ্যে ফিরে।