প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও আর্থিক অপরাধ দমনের কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে।
বুধবার জাতীয় সংসদে দুটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে আধা ঘণ্টা নির্ধারিত ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরের জন্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এটি প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রথম প্রশ্নোত্তর পর্ব।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১১ ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান জড়িত।
এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, এইচ বি এম ইকবাল, সামিট গ্রুপসহ তাদের পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে’ অর্থ পাচার ও দুর্নীতির তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির তথ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা)। পাচারকৃত অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ ও পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এজন্য ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (এমএএলটি) সম্পাদনের প্রক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়না। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মতি দিয়েছে, অন্য ৭টি দেশের সঙ্গে প্রক্রিয়াধীন।
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর নেতৃত্বে সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠিত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আদালত এ পর্যন্ত (২৫ মার্চ ’২৬) ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক (সংযুক্ত) ও অবরুদ্ধ করেছে। এর মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ। পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে মোট ১৪১টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টিতে চার্জশিট দাখিল এবং ৬টিতে রায় হয়েছে।
প্রচলিত আইনে শাস্তি
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সত্তা। অতীতে দেখা গেছে, সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁদের ইচ্ছা, আগ্রহের কারণে দেশের আইনকানুন, নীতিনৈতিকতার তোয়াক্কা না করে, যাকে যে রকম হয়েছে, উঠিয়ে নিয়ে গেছে। যার কাছ থেকে যে রকম মনে হয়েছে, জোর করে কিছু লিখে নিয়ে গেছে।
সংসদ নেতা বলেন, বর্তমান সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রচলিত আইন মেনে কাজ করতে চায়। যাতে কোনো মানুষ ন্যায্য আইন থেকে বঞ্চিত না হয়। সরকার আইনগতভাবেই সব প্রক্রিয়া গ্রহণ করবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে। যারা দেশের ও জনগণের অর্থ পাচার করেছে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হবে।
আরেক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এক কথায় যদি বলতে হয় এটি (পাচার হওয়া অর্থ) জনগণের অর্থ। যেহেতু আমরা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সত্তা, জনগণের প্রতি এবং দেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে; খুব স্বাভাবিকভাবেই জনগণের অর্থ ফিরিয়ে এনে দেশ ও জনগণের জন্য ব্যয় করা এই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কাজেই এ ব্যাপারে যেভাবেই হোক, যে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণের অর্থ ফেরত আসবে, এই সরকার সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’
ফ্যামিলি কার্ডে পরিবারের সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে
সরকারি দলের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১০ মার্চ ১৩টি জেলার ৩টি করপোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু হয়েছে। এতে প্রথমে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবার ভাতা পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে আরও ৩০ হাজার পরিবার অন্তর্ভুক্ত হবে। আগামী চার বছরে ৪ কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে আনা হবে।
ফ্যামিলি কার্ড নারী সদস্যের নামে দেওয়ার কারণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এতে সহায়তা সরাসরি খাদ্য, পুষ্টি, চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যয় হবে এবং নারীর নামে কার্ড থাকায় পরিবারের সম্পদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে।
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ এসবের ইতিবাচক দিক আছে, কিন্তু খরচ কত এবং মুদ্রাস্ফীতি হলে পরিকল্পনা কী? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনই বাজেট বলছেন না। পর্যায়ক্রমে এগিয়ে নেওয়া হবে, প্রতি মাসে উপকারভোগী বাড়বে এবং বাজেট বাড়ানো হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিচ্ছে না। তাই মূল্যস্ফীতি হবে না, বরং এ টাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যয় হবে। অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হবে।
এ বি এম মোশাররফের সম্পূরক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে জনগণই ক্ষমতার উৎস। দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে এবং সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচি চালু হবে।
বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমরা অতীতে দেখেছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রকম কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি দেওয়া) করেছিল। কেউ কেউ বিভিন্ন রকম টিকিটও বিলি করেছিল। তবে বিএনপির প্রতি জনগণ যে সমর্থন দিয়েছে, তাতে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সব পরিকল্পনার প্রতি মানুষের সমর্থন রয়েছে। দেশের মানুষ জাতীয়তাবাদী দলের ওপর আস্থা রেখেছেন।’






