বাংলাদেশের মতো জাপানও চার ঋতুর দেশ। এখানকার বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ ও শীত—প্রতিটি ঋতু আলাদা আবেগ, অনুভূতি ও রঙ নিয়ে প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে। প্রত্যেক ঋতু যেন নিজস্ব গল্প বলে, যার ভাঁজে স্মৃতি, বিস্ময় ও মায়া লুকিয়ে থাকে।

জাপানের উত্তরাঞ্চলে এই ঋতুগুলোর সৌন্দর্য আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। প্রকৃতিকে শুধু দেখাই নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। প্রতি ঋতুর জন্য নির্দিষ্ট রং মানুষের জীবনকেও রঙিন করে। বসন্ত মানে গোলাপি সাকুরার কোমল ছোঁয়া, যা চারপাশকে স্বপ্নময় করে তোলে।

বসন্তে সাকুরা ফোটে, সেই দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। চারদিক ফুলে ভরে যায়, যেন আকাশ থেকে কোমল পাপড়ি নেমে এসেছে। গোলাপি আভায় প্রকৃতি লজ্জায় রাঙা হয়। এই অপূর্ব দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বাতাসে মৃদু সুবাস ভাসে, যা মনকে প্রশান্ত করে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

গ্রীষ্ম সবুজের উচ্ছ্বাস নিয়ে আসে। সাকুরার ফুল ঝরে, গাছগুলো ঘন সবুজ পাতায় ভরে ওঠে। এই সবুজ ছোঁয়া প্রকৃতিতে নতুন জীবন ফিরিয়ে আনে, মনে সজীবতা জাগায়।

শরতে পাতাগুলো হলুদ ও লালচে হয়ে যায়। এই পরিবর্তনে বিষণ্নতা ও সৌন্দর্য মিশে থাকে। ঠান্ডা বাতাসে পাতা ঝরলে মনে হয় প্রকৃতি গল্পের শেষ অধ্যায় লিখছে।

শীতে তুষারের সাদা চাদর সবকিছু ঢেকে দেয়। নদী, মাঠ, রাস্তা একাকার হয়। সেই সাদা পৃথিবীতে সময় যেন থেমে যায়, নিস্তব্ধতা হৃৎস্পন্দন পর্যন্ত শোনা যায়।

ইওয়াতে প্রিফেকচারে আমার জীবন এই চার ঋতুর মাঝে বোনা। গিফু প্রিফেকচার থেকে এখানে এসে প্রকৃতিকে নতুনভাবে চিনেছি। ইওয়াতে প্রিফেকচার জাপানের তোহকু অঞ্চলে অবস্থিত। এর সৌন্দর্য গভীর, চ্যালেঞ্জও আছে—ভূমিকম্প, ঠান্ডা, প্রকৃতির নানা রূপ। তবু সৌন্দর্য সব ছাপিয়ে যায়।

ইওয়াতেতে সাকুরা একটু দেরিতে ফোটে। মার্চ, এপ্রিল, মে বসন্তকাল হলেও মার্চের শেষে শীতের ছোঁয়া থাকে। ভোরের ঠান্ডা বাংলাদেশের শীতের চেয়ে বেশি কনকনে।

এই বছরও মরিওকা শহরে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে সাকুরা ফোটার কথা। ফুল পূর্ণ হয়ে উঠলে শহর বদলে যায়। বাতাসে উড়ন্ত পাপড়ি ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির মতো।

সাকুরা জাপানের সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও জীবনের অংশ। গাছগুলো যত্ন করে লাগানো হয় নদীর পাড়, রাস্তায়। হালকা বাতাসে পাপড়ি ঝরলে গোলাপি তুষারের মতো। জাপানিরা হানামি উৎসবে এটি উপভোগ করে—পার্কে দল বেঁধে খাওয়া-দাওয়া, গল্প। হানা মানে ফুল, মি মানে দেখা। রাতে লাইটিং হয় ইয়োজাকুরা নামে, আলো-ফুলের জাদুকরি পরিবেশ তৈরি করে।

জাপানের শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় ১ এপ্রিল থেকে, সাকুরার সঙ্গে। এটি নতুন শুরুর প্রতীক। আমার মেয়ের শোগাক্কো শুরু হবে এপ্রিলে—নতুন বিদ্যালয়, বন্ধু, অভিজ্ঞতা। দূর পরবাসে এই শুরু মনকে আবেগে ভরায়।

সাকুরা মনে করিয়ে দেয় জীবন ক্ষণস্থায়ী। এর সৌন্দর্য কয়েক দিনের, তেমনি আমাদের মুহূর্ত অমূল্য। প্রতিটি মুহূর্ত ভালোবাসতে, অনুভব করতে হয়।

লেখক পরিচিতি: সঞ্জয় সরকার, অধ্যাপক, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে জাপানের ইওয়াতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী গবেষণা সেন্টারে কর্মরত