নব্বই দশকে শৈশব-কৈশোর কাটানো আমরা হুমায়ূন আহমেদকে এক আবেগের নাম বলেই জানি। তাঁকে সামনাসামনি না চিনলেও তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা হয়ে উঠেছিল আমাদের আপনজন। টেলিভিশনের পর্দা ছাড়িয়ে সেই চরিত্ররা আমাদের জীবনেই বাসা বেঁধেছিল। এখনো সেগুলো কিংবদন্তি। তাঁর চরিত্রগুলোর মধ্যে হিমু ছিল সবচেয়ে প্রিয়। কটকটে হলুদ পাঞ্জাবি তখন আমাদের দুর্লভ প্রিয়। বাকের ভাইয়ের কথা তো আলাদা করে বলারও নয়। ছোট ছোট চরিত্রগুলোকেও হুমায়ূন আহমেদ এত মমতায় গড়তেন যে তারা পরিবারের সদস্য হয়ে উঠত। এখানেই তিনি অন্য সমসাময়িক লেখকদের থেকে আলাদা ছিলেন। তাঁর লেখায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ আর তাদের জীবনবোধই প্রধান উপাদান।

নির্মাতা হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন অদ্বিতীয়। ‘আগুনের পরশমণি’ ছবির শেষ দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে—বদি সূর্যের আলো ধরতে হাত বাড়িয়ে দেয়। সিনেমাবোদ্ধা না হলেও এই দৃশ্য মনে গেঁথে আছে। লেখা থেকে ছবি তো ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের লেখা। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ শুরুতেই জানানো হয়েছে, এটা তাঁর উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত। পরিচালক যেন ঝুঁকিটা গায়ে পড়ে নিয়েছেন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ক্যাম্বেলটাউনের ডুমারেস্ক সিনেমা হলে প্রথম শো ছিল হাউসফুল। শুরুর অনেক আগে দর্শকরা জড়ো হয়েছিলেন। পোস্টারের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি রক্ষা করলেন, পরস্পরের সঙ্গে কথা বললেন। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে ছবি শুরু হলো। পুরো সময় হল মুখরিত ছিল। হাসির দৃশ্যে হাসাহাসি, আবেগের মুহূর্তে পিনপতন নীরবতা। এতে বোঝা গেল, উপন্যাসের মতো দর্শকরা ছবির সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন।

নির্মাণের সুবিধায় মূল গল্পে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এগুলো ছবিকে আরও হৃদয়স্পর্শী করেছে। গল্পের বুনন জমজমাট হয়েছে, দর্শকের মনোযোগ ধরা পড়েছে। পরিবর্তনগুলো বলছি না, হলে গিয়ে দেখলে চমক পাবেন। হুমায়ূন আহমেদের স্বভাবসুলভ সংলাপ অক্ষত রয়েছে। নতুন চরিত্র যোগ হয়েছে, চরিত্রদের স্বভাব-কর্মে পরিবর্তন এসেছে। নতুন প্রজন্মের চরিত্র যোগ করে বর্তমান দর্শকদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। উপন্যাস না পড়লেও ছবি উপভোগ করা যাবে।

ছবি শেষে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে হল ভরে উঠল। সব বয়সী একই কথা বললেন, ছবিটা প্রাণভরে উপভোগ করেছি। চরিত্রদের খুশিতে হেসেছি, দুঃখে কেঁদেছি। ছেলেমেয়ে সবার চোখ ভেজা, মুখে হাসি। দলবেঁধে আসা দর্শকদের উল্লাস বেশি। অভিনয় নিয়ে কথা হলো, মোশারফ করিমের প্রশংসা সবার মুখে। বলা হচ্ছিল, এটা তাঁর অভিনয়জীবনের নতুন মাইলফলক। দূর থেকে আসা কেউ বললেন, “আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমরা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস পড়ে বড় হয়েছিলাম।”

ব্যক্তিগত মূল্যায়নে বলি, প্রত্যেক চরিত্র অসাধারণ অভিনয় করেছে। ছোটরা সবসময় আদরণীয়। নিতু চরিত্রের অভিনয় সবচেয়ে ভালো লেগেছে, মুখের অভিব্যক্তি এখনো চোখে ভাসছে। নতুন প্রজন্মের ভর্তি পরীক্ষার ঘটনায় নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছি। আমাদের সময় দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পাশাপাশি দিনে, কিন্তু দূরে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বাস রাতে না পৌঁছে অনেকে পরীক্ষা দিতে পারেনি। সেই বয়সের আবেগ ছুঁয়ে গেছে। বন্ধুত্ব-প্রেমের রসায়ন যুগে যুগে একই।

আয়মান আসিব, সামিউল ভূঁইয়া ও সুস্ময় সরকারের গল্পের পরিবর্তনগুলো ধন্যবাদের দাবিদার। এগুলো চরিত্রগুলোর ভিত্তি মজবুত করেছে। প্রত্যেক চরিত্রের নিজস্ব গল্প তুলে ধরা ভালো লেগেছে। ভালো-মন্দ মনে ফেলার পর অতীত দেখলে দর্শক মমতাবোধ করেছেন। ছবির ধারাবর্ণনে চমক ছিল, যা গতিশীলতা ধরে রেখেছে। দৃশ্য নির্মাণ দর্শকের মনোযোগ ধরেছে। সব মিলিয়ে দর্শকদের পয়সা উশুল হয়েছে।

প্রবাসের একঘেয়েমিতে দেশের ছবি আনন্দ যোগায়। ব্যবসায়িকতা এড়িয়ে এ আয়োজনের জন্য বঙ্গজ ফিল্মসের তানিম ভাই ধন্যবাদ পাবেন। ব্যক্তিগত জীবনের চড়াই–উতরাই পার করে এমন আয়োজন চালিয়ে যাওয়া অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। বঙ্গজ ফিল্মস ভবিষ্যতেও এ ধারা চালিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস। পরিশেষে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ুক।